নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: এআই
শহরের ব্যস্ততা কমে এলে মধ্যরাতে যখন আমরা শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হই, তখন একদল মানুষ ঘাম ঝরিয়ে চাকা ঘুরিয়ে চলেন অন্যের স্বপ্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। কিন্তু গত রোববার রাতে যশোরের ভাটপাড়া এলাকায় যা ঘটল, তা কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়—বরং সকলের সামষ্টিক মানবিকতার চরম পরাজয়। সামান্য একটি রিকশার জন্য ৫৫ বছর বয়সী শ্রমজীবী আলমগীর হোসেনকে হত্যা করল দুর্বৃত্তরা।
নিহত আলমগীর হোসেন যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া বড় মাদ্রাসা এলাকার মৃত রজব আলীর ছেলে। ঝুমঝুমপুর শ্মশানের পাশে একটি জীর্ণ ভাড়া ঘরে ছিল তার টানাপোড়েনের সংসার। জীবন সায়াহ্নে এসেও দুমুঠো ভাতের লড়াইয়ে প্যাডেল ঘোরাতে হতো তাকে। রোববার রাত ১০টার দিকে ভাটপাড়া প্রাইম ইটভাটার নির্জন রাস্তায় যখন আলমগীর হোসেন রিকশা নিয়ে ফিরছিলেন, তখন অন্ধকার থেকে হানা দেয় একদল মানুষরূপী দানব। তাদের লক্ষ্য ছিল আলমগীরের রক্তপানি করা শ্রমে কেনা রিকশাটি।
বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো তার শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে সর্বস্ব দিয়ে লড়েছিলেন। কিন্তু সেই লড়াইয়ের মূল্য দিতে হলো তাকে নিজের প্রাণ দিয়ে। দুর্বৃত্তদের উপর্যুপরি আঘাতে পিষ্ট আলমগীরকে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে তারা রিকশাটি নিয়ে নির্বিঘ্নে চম্পট দেয়। পথচারী গোলাম রাব্বি যখন তাকে নিথরপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করেন, তখন আলমগীরের শেষ নিশ্বাসটুকুও যেন বিচার চাইছিল এই সভ্য সমাজের কাছে। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনাটি একটি সাধারণ ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে ঘটলেও এর ফলে একজন শ্রমজীবী মানুষের মূল্যবান প্রাণহানি ঘটেছে, যা সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, হয়তো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট শেষে আইনি প্রক্রিয়াও চলবে। কিন্তু আলমগীরের শূন্য ঘরে যে হাহাকার শুরু হলো, তার দায় কার? এই নৃশংসতা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন রূপটি সামনে এনেছে। আলমগীরের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সমাজ এক ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবমান। এই অন্ধকার পথের হিংস্রতা রুখতে না পারলে, কাল হয়তো এই নিষ্ঠুরতার থাবা সবার দরজাতেও কড়া নাড়বে। আলমগীরের রক্তের দাগ কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেবে না?