এম জামান
বটিতে পা দিয়ে তরকারি কুটছেন সাকিরন খাতুন ছবি: ধ্রুব নিউজ
শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় মানুষের জীবনকে থমকে দেয়, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই যে পথচলা থামাতে পারে না—তার জীবন্ত উদাহরণ সাকিরন খাতুন। মানুষের সাধারণত দুটো হাত, দুটো পা থাকে। সাকিরনের জন্ম থেকেই দুটো হাত নেই। তার এই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে গত ছয় দশক ধরে জীবনযুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন তিনি । যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামের এই নারী এখন অদম্য এক সাহসের অনুপম নজির।
সাকিরন খাতুনের 'হাত নেই'—এই আক্ষেপ করার ফুরসত মেলেনি কোনোদিন। ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের দুই পা-কে হাতের বিকল্প হিসেবে তৈরি করেছেন। সাধারণ মানুষের মতো ঘরের প্রায় সব কাজই তিনি পা দিয়ে করেন । মেঝেতে বসে পা দিয়ে বঁটি চেপে ধরে মাছ কাটা কিংবা তরিতরকারি—সবই তিনি করেন সুচারুভাবে। শুধু রান্না নয়, বাড়ির আঙিনা ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে ঘর মোছা—প্রতিটি কাজই করেন পরম মমতায়।
সাকিরনের এই পথচলা ছিল কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ। এক সময় তিনি পা দিয়ে সুঁই-সুতোয় কাঁথা সেলাইও করতেন। এমনকি কোদাল দিয়ে মাটি কাটার মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজও করেছেন পা দিয়ে। তিনি জানান, মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই নিজের সব কাজ নিজে করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। এক সময় তিনি ঢেঁকিতে ধান ভানতেও পারতেন। তবে এখন বয়স ষাটের কোটা পেরিয়েছে, তাই শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না।
সাকিরন খাতুন বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমি পা দিয়ে সব করতি পারি। মাছ কাটা, সবজি কাটা, মাটি কাটা—সবই করি। শুধু কাপড় পরা আর চুল বাঁধা ছাড়া প্রায় সব কাজই একা একা সারি। আগে আরও শক্ত কাজ করতি পারতাম, এখন বুড়ো হয়েছি তো, তাই শরীর আর আগের মতো কুলায় না।’
দুই হাত নেই বলে সাকিরনের জীবনে কোনো জীবনসঙ্গী জোটেনি। বিয়ে না করায় তার নিজের কোনো আলাদা সংসারও গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে তিনি কখনো ভাইয়ের বাড়িতে, আবার কখনো বোনদের আশ্রয়ে দিন কাটান। পরিবারের সদস্যরাও তাকে অনেক ভালোবাসেন। সাকিরনের ভাগনে আব্দুল আহাদ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই খালার এই জীবনযুদ্ধ দেখে আসছি। তিনি কখনো কারোর বোঝা হতে চাননি। আমাদের ছোটবেলায় খুব আদর-যত্ন করে মানুষ করেছেন। এখন আমরা চেষ্টা করি তাকে যতটা সম্ভব শান্তিতে রাখতে।’
বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন সাকিরন। সরকারিভাবে সামান্য প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও তা দিয়ে চিকিৎসার খরচ জোগানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সাকিরন আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এখন শরীরটা খুব অসুস্থ থাকে। সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া, শেষ বয়সে তারা যেন আমার চিকিৎসার জন্য একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।’