ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
পুলিশিং সমাবেশ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির ছবি: সংগৃহীত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে নিজ বিভাগ থেকেই কঠোর অভিযান বা 'শুদ্ধি অভিযান' শুরু করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত দুই মাসে বাহিনীর বিভিন্ন পদমর্যাদার ২৭ জন কর্মকর্তা ও সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এসব তথ্য জানান।
অপরাধে যুক্ত থাকা পুলিশ সদস্যদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আইজিপি বলেন, "মাদকের বিষয়ে পুলিশের ভেতর থেকে আমরা অভিযান শুরু করেছি। অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকায় গত দুই মাসে আমি ২৭ জন পুলিশ অফিসার ও সদস্যকে জেলে পাঠিয়েছি। আপনারা আর কী দেখতে চান? আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি, যাতে পর্যায়ক্রমে পুরো সমাজকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব হয়।"
তিনি আরও বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে থেকে কোনো পুলিশ সদস্য নিজে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে তা বরদাশত করা হবে না। বিগত দিনে পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর ও দুর্বল করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পরিবহন ও জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে পুলিশপ্রধান জানান, বাহিনীর চাহিদার তুলনায় বর্তমানে অন্তত আড়াই হাজার যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে। অধিকন্তু, বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ গাড়ির বয়স আট থেকে ২০ বছর পর্যন্ত, যা জরুরি সেবায় জটিলতা তৈরি করে।
এই পরিবহন সংকট কাটাতে এবং পুলিশের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ নতুন যানবাহন ক্রয়ের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা গত সপ্তাহে সরকারি অনুমোদন পেয়েছে।
এছাড়া আইজিপি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাহিনীর জনবল সংকট একবারে মেটানো না গেলেও, প্রতি বছর গড়ে অন্তত ১৫ হাজার নতুন পুলিশ সদস্য নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে মাদক, কিশোর গ্যাং ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জোর আহ্বান জানান আইজিপি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ নতুন শিক্ষিত তরুণ বেকার জনগোষ্ঠীর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এই বিশাল তরুণদের অপরাধ ও মাদকের কালো ছায়া থেকে দূরে রাখতে সার্বিক সামাজিক উদ্যোগ জরুরি।
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-র সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে।
অপরাধ শনাক্তকরণে স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা করে আইজিপি বলেন, অনেক সময় এলাকার অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের চেয়ে স্থানীয় মানুষ বেশি তথ্য জানেন। জনগণের সঙ্গে সঠিক সমন্বয় থাকলে অপরাধ দমন সহজ হবে।
অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে আইজিপি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যারা দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল করতে চায়, তাদের সঙ্গে যোগসাজশকারীরা কখনো প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে পারে না।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলামের সভাপতিত্বে ওই মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ পারভীন আক্তার এবং বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনুসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।