আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
শাবান মাস ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত বরকতময় একটি মাস। এটি পবিত্র রমযানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই মাসে রমযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অধিক পরিমাণে নফল রোযা রাখতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। শাবান মাসের মধ্যরজনী বা শবে বরাত মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত লাভের এক অনন্য সুযোগ।
শাবান মাসের গুরুত্ব ও নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমল
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে শাবান মাসের মতো এত অধিক রোযা রাখতেন না। তিনি বলতেন:
"আমি রমযান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ রোযা রাখিনি। শাবান মাসেই আমি সর্বাধিক রোযা রাখি।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯৬৯)
উসামা বিন জায়েদ (রা.) যখন নবীজীকে এই মাসে অধিক রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি উত্তর দিলেন:
"শাবান এমন একটি মাস যা মানুষ অবহেলা করে; অথচ এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আমি চাই, যখন আমার আমল পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোযা অবস্থায় থাকি।" (নাসায়ী, হাদীস: ২৩৫৭)
শবে বরাতের ফজিলত
শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাতটি বিশেষ রহমতের রাত। হাদীস শরীফে এসেছে:
"আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং শিরককারী ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।" (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৫৬৬৫)
করণীয় আমল
এই রাতে কোনো নির্দিষ্ট বা বাধ্যতামূলক ইবাদত নেই, তবে সুন্নাহ ও সলফে সালেহীনদের অনুসরণে নিম্নোক্ত আমলগুলো করা যেতে পারে:
ক. নফল রোযা রাখা
শাবান মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে (আইয়ামে বীয) রোযা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ। বিশেষ করে ১৫ তারিখের রোযা রাখা এ রাতের আমলের অন্তর্ভুক্ত। তবে রমযানের ঠিক ১-২ দিন আগে রোযা রাখা নিষেধ যাতে শরীরের শক্তি বজায় থাকে।
খ. দীর্ঘ নফল নামায
নিভৃতে দুই রাকাত করে নফল নামায আদায় করা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতে দীর্ঘ সিজদা করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, এক রাতে নবীজী এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে তিনি ভেবেছিলেন নবীজী ইন্তেকাল করেছেন। (বাইহাকী, ৩/৩৮২)
গ. কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির
আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করা, দরূদ শরীফ পাঠ করা এবং তওবা-ইস্তেগফার করা। এটি আত্মিক প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
ঘ. দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা
শেষ রাতে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করে নিজের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য গুনাহ মাফ ও রহমত প্রার্থনা করা। হাদীস অনুযায়ী, রোযাদারের দুআ আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।
বর্জনীয় রেওয়াজ
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু ভিত্তিহীন প্রথা প্রচলিত আছে যা ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট করে। যেমন:
আলোকসজ্জা ও আতশবাজি: ঘরবাড়ি বা মসজিদ আলোকসজ্জা করা এবং পটকা ফোটানো সম্পূর্ণ অপচয় ও বিজাতীয় সংস্কৃতি।
অপ্রয়োজনীয় হুল্লোড়: ইবাদতের রাতে রাস্তায় আড্ডা দেওয়া বা উচ্চশব্দে মাইক বাজানো।
মাজার বা কবরস্থানে ভিড়: ঘটা করে কবরস্থানে যাওয়া বা কবরে মেলা বসানো শরিয়তসম্মত নয়। তবে সংক্ষেপে কবর জিয়ারত করা যেতে পারে।
হালুয়া-রুটির আনুষ্ঠানিকতা: এই রাতকে কেবল খাওয়া-দাওয়ার উৎসব হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) বলেন:
"এ রাতের নিকৃষ্ট বিদআতগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘর-বাড়ি বা দোকান আলোকসজ্জা করা এবং আতশবাজি করা। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।" (মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ, পৃ. ৩৫৩)
উপসংহার
শবে বরাত আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ মাফের এক বিশেষ সুযোগ। এই রাতে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করে ইখলাসের সাথে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়া। নবীজীর সুন্নতের অনুসরণে ইবাদত ও আমলের মাধ্যমে আমরা যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি, আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: খতিব ও আলেমে দীন
*মতামত লেখকের নিজস্ব