আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
ইসলামে নেতৃত্ব কোনো নিছক রাজনৈতিক অর্জন বা ক্ষমতার দাপট নয়; বরং এটি একটি গুরুভার আমানত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত অত্যন্ত কঠিন এক দায়িত্ব। কোরআন ও হাদিসে নেতৃত্বকে এমন এক পরীক্ষার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে আখিরাতের কঠিন বিচারালয়ে।
এই ভয়ংকর দায়বদ্ধতার কারণেই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) নেতৃত্ব গ্রহণ করতে শঙ্কিত হতেন এবং অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করতেন। অথচ আজকের ভোগবাদী সমাজে নেতৃত্ব যেন আমানত থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষমতা, দোহাই এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নেতৃত্বের প্রকৃত মানদণ্ড পুনর্মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।
নেতৃত্বের মূল ভিত্তি: আমানত ও যোগ্যতা
কোরআন মাজিদ নেতৃত্বের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে 'যোগ্যতা' এবং 'আমানতদারিতা'কে নির্ধারণ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার যোগ্য প্রাপকের নিকট পৌঁছে দাও।" (সূরা নিসা: ৫৮)
এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নেতৃত্ব কোনো দলীয় পুরস্কার, বংশীয় ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার নয়। বরং এটি একটি পবিত্র আমানত যা কেবল যোগ্য ব্যক্তিরই প্রাপ্য। যোগ্য ব্যক্তিকে পাশ কাটিয়ে অযোগ্য বা চাটুকার কাউকে দায়িত্ব দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সরাসরি খেয়ানত।
জ্ঞান ও বিশ্বস্ততা: নবী ইউসুফ (আ.)-এর আদর্শ
নেতৃত্বের জন্য কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকা অপরিহার্য। হজরত ইউসুফ (আ.) যখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তিনি নিজের গুণাবলি এভাবে তুলে ধরেন:
"আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিয়োগ দিন; নিশ্চয়ই আমি হাফিজ (বিশ্বস্ত রক্ষক) ও আলিম (সুনিপুণ জ্ঞানসম্পন্ন)।" (সূরা ইউসুফ: ৫৫)
এখানে লক্ষণীয় যে, তিনি তার বংশমর্যাদা বা জনপ্রিয়তার দোহাই দেননি। বরং সততা (আমানত) এবং কর্মদক্ষতা (জ্ঞান)—এই দুটি গুণকে নেতৃত্বের মাপকাঠি হিসেবে পেশ করেছেন।
ন্যায়বিচার: নেতৃত্বের নৈতিক মেরুদণ্ড
ইসলামী নেতৃত্বের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো ইনসাফ বা ন্যায়বিচার। দল-মত ও আত্মীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের ওপর অটল থাকা নেতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সাক্ষ্য দাও—এমনকি তা যদি তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও যায়।" (সূরা নিসা: ১৩৫)
ব্যক্তিগত লাভ বা দলীয় সংকীর্ণতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হওয়া ইসলামী নেতৃত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
হাদিসের সতর্কবাণী: নেতৃত্ব সম্মান নয়, জবাবদিহিতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেতৃত্বকে কেবল দুনিয়াবি দৃষ্টিতে দেখেননি, বরং এর পরকালীন পরিণতির কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
"নিশ্চয়ই নেতৃত্ব একটি আমানত। কিয়ামতের দিন তা লজ্জা ও অনুশোচনার কারণ হবে—তবে সে ব্যক্তি ছাড়া, যে এর হক আদায় করেছে এবং অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে।" (সহিহ মুসলিম)
ক্ষমতার মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কিন্তু মুমিন নেতার হৃদয়ে সর্বদা আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করার ভয় কাজ করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.)-কে উপদেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি নিজে থেকে নেতৃত্ব না চান। কারণ, চেয়ে নেওয়া নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য থাকে না।
অযোগ্যকে প্রধান করার ভয়াবহতা
বর্তমান সময়ে অযোগ্য ও অদক্ষ নেতৃত্বের জয়জয়কার একটি বড় সংকট। অথচ রাসূল (সা.) কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন:
"যাকে মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হলো, অথচ সে জানে যে সেখানে তার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি আছে, তবে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল।" (মুসনাদ আহমদ)
সুতরাং অযোগ্যদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি বড় মাপের ঈমানি ও নৈতিক অবক্ষয়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে আদর্শ নেতৃত্বের সংকট দীর্ঘদিনের। এ অবস্থায় ইসলাম আমাদের স্থবির হয়ে থাকার শিক্ষা দেয় না। ইসলামের একটি ফিকহি মূলনীতি হলো—যদি দুটি মন্দের মধ্য থেকে একটি বেছে নিতেই হয়, তবে যেটিতে ক্ষতির পরিমাণ কম, সেটিকেই গ্রহণ করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে 'ভোট' দেওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। ভোট দেওয়া মানে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করা। কোরআন সাক্ষ্য গোপন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে:
"তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; আর যে ব্যক্তি তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী।" (সূরা বাকারা: ২৮৩)
ভোটের মাধ্যমে আমরা সাক্ষ্য দিই যে, বর্তমান বিকল্পগুলোর মধ্যে এই ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বা অধিকতর যোগ্য। তাই ভোটদান থেকে বিরত থাকা কিংবা জেনে-শুনে অযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থন করা—উভয়ই আমানতের পরিপন্থী কাজ।
মূলকথা
নেতৃত্বের এই সংকট মূলত ক্ষমতার নয়, বরং চারিত্রিক ও আদর্শিক। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পথই পারে আমাদের এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে। এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করবে। দল ও গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে এবং জাগতিক বিচারের চেয়ে মহাবিচারকের আদালতকে বেশি ভয় করবে।
আজকের বাংলাদেশে হয়তো সেই আদর্শ নেতৃত্বের পূর্ণ প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু সেই ঐশী মানদণ্ডকে সামনে রেখেই বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের ঈমানি দায়িত্ব।
লেখক: আলেমে দীন ও খতিব