আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
শাবান কোনো সাধারণ মাস নয়। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক সেতু, যা একজন মুমিনকে গাফলতির উপকূল থেকে টেনে নিয়ে যায় রমযানের আলোকিত প্রান্তরে। এই মাস মূলত ঘোষণা দেয়—এখন সময় আত্মশুদ্ধি করার, এখন সময় আল্লাহর দিকে পূর্ণ মনোযোগে ফিরে আসার।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোযা রাখতে দেখিনি, যতটা শাবান মাসে রাখতেন।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এটি প্রমাণ করে, শাবান মাস হলো ইবাদতের অনুশীলনক্ষেত্র; যেখানে বান্দা নিজেকে রমযানের কল্যাণময় সাধনার জন্য প্রস্তুত করে।
শাবান: আমলনামা পেশ হওয়ার মাস
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘এটি এমন এক মাস, যাতে মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই, আমার আমল এমন অবস্থায় পেশ হোক, যখন আমি রোযাদার।’ (সুনানে নাসায়ি)
এ হাদিস শাবানের গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দেয়। এই মাসে একজন সচেতন মুমিন নিজের আমলের দিকে ফিরে তাকায়—কোথায় অবহেলা হয়েছে, কোথায় গুনাহ জমেছে, কোথায় আল্লাহর হক অপূর্ণ রয়ে গেছে।
নফল রোযা: প্রবৃত্তি দমনের প্রশিক্ষণ
শাবানের অন্যতম সৌন্দর্য হলো নফল রোযা। এটি শুধু ক্ষুধা-পিপাসার অনুশীলন নয়; বরং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা। নফল রোযা:
· নফসের লাগাম টানে,
· গুনাহের প্রতি আগ্রহ কমায় ও
· রমযানের ফরজ রোযাকে সহজ করে।
তবে ইসলাম ভারসাম্যের ধর্ম। তাই রোযা হবে সামর্থ্য অনুযায়ী, যেন ফরজ ইবাদতে শৈথিল্য না আসে।
তওবা: হৃদয় পরিশুদ্ধ করার মৌলিক চর্চা
শাবান হলো তওবার মৌসুম। শুধু মুখে 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলাই তওবা নয়; বরং:
· গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প,
· ভবিষ্যতে না করার অঙ্গীকার ও
· আল্লাহর কাছে বিনয়পূর্ণ প্রত্যাবর্তন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সূরা নূর: ৩১)
কুরআন: রমযানের আগের বন্ধুত্ব
রমযান কুরআনের মাস, আর শাবান হলো সেই বন্ধুত্ব পুনর্গঠনের সময়। শাবান মাসে:
· তিলাওয়াতের রুটিন তৈরি করা,
· অর্থ বোঝার চেষ্টা করা ও
· কুরআনের আলোকে নিজের জীবন যাচাই করা।
যে ব্যক্তি শাবানে কুরআনের সাথে সময় কাটায়, রমযানে তার হৃদয় কুরআনের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে।
যিকির ও ইস্তিগফার: অন্তরের ধূলিকণা ঝেড়ে ফেলা
ইস্তিগফার গুনাহের কালিমা ধুয়ে দেয়, আর যিকির হৃদয়কে জীবিত রাখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যার হৃদয় যিকির ছাড়া, তার হৃদয় মৃত।’ (মুসনাদে আহমাদ)
শাবানে যিকিরে অভ্যস্ত হওয়া মানে রমযানে একাগ্রতার ভিত্তি স্থাপন করা।
অন্তরের পরিশুদ্ধতা: ইবাদতের আত্মা
বিদ্বেষ, হিংসা ও অহংকার—এসব অন্তরের রোগ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়; তবে যার অন্তরে বিদ্বেষ থাকে, তার ক্ষমা স্থগিত রাখা হয়।’ (সহিহ মুসলিম)
তাই শাবান মাসে ক্ষমা করতে শেখা, সম্পর্ক ঠিক করা এবং অন্তর হালকা করা জরুরি।
লেখক: আলেমে দীন ও খতিব