ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এই ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল তা নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। উদ্ধার করা সুইসাইড নোট ও ডায়েরির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত করা হচ্ছে।এই ঘটনা ব্লু-হোয়েল বা পাবজি আসক্তির ভয়াবহ স্মৃতি আবারও উসকে দিয়েছে।
ভারতে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে তিন বোন একটি বহুতল ভবনের ৯ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। তাদের বয়স যথাক্রমে ১২, ১৪ ও ১৬ বছর।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে পাওয়া প্রাথমিক খবরে ধারণা করা হচ্ছে, এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যে আছে অনলাইনে কোরীয় গেম ও সংস্কৃতিতে তিন বোনের আসক্তি।
মঙ্গলবার গভীর রাতে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। লাফ দেওয়ার আগে তিন বোন হাতে লেখা একটি সুইসাইড নোট রেখে যায়, যেখানে লেখা ছিল—‘সরি পাপা’।
ডায়েরির শুরুতে তারা লিখেছে, “এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে সব পড়ে নিন, কারণ এর প্রতিটি শব্দ সত্য। এখনই পড়ুন। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি পাপা।” লেখার শেষে তারা একটি বড় কান্নার ইমোজি এঁকেছে।
উদ্ধার হওয়া আট পৃষ্ঠার ডায়েরিতে দেখা যায়, এই কিশোরীরা তাদের গেমিং অভ্যাস, মোবাইল ব্যবহারের বিবরণ ও মানসিক অবস্থার কথাও লিখে গেছে।
তাদের শোবার ঘরের দেয়ালেও কিছু লেখা পাওয়া গেছে। সেখানে লেখা ছিল, “আমি খুব একা, আমার জীবনটা ভীষণ নিঃসঙ্গ”।
মৃত তিন বোন- বিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) এবং পাখি (১২) সবসময় ছায়ার মতো একে অপরের সঙ্গে থাকত। পুলিশ জানায়, আত্মহত্যার আগে তারা বারান্দায় গিয়ে দরজা ভেতর থেকে লক করে দিয়েছিল।
পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার আগেই তারা ঝাঁপ দেয়। ঘটনাস্থলে একটি দু’ধাপের মই পাওয়া গেছে, যা ব্যবহার করে তারা রেলিংয়ের ওপর উঠেছিল।
গাজিয়াবাদের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ (ডিপিসি) নিমীশ প্যাটেল জানান, প্রাথমিক তদন্তে এটি কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব এবং অনলাইন গেমের ‘টাস্ক’ বা নির্দেশাবলী পূরণের ফল বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের অনুমান, এটি গেমের শেষ ‘টাস্ক’ বা নির্দেশের অংশ ছিল। তিন বোন গত ২-৩ বছর ধরে একটি বিশেষ কোরিয়ান অনলাইন গেমে আসক্ত ছিল এবং গেমের দেওয়া বিভিন্ন টাস্ক সম্পন্ন করত।
এমনকি তারা নিজেদের আসল নাম বদলে কোরিয়ান নামও গ্রহণ করেছিল। ২০২০ সালের লকডাউন থেকে এই তিন বোন গেমটিতে আসক্ত হয়ে পড়ে। মেজ বোন প্রাচী গেমিং এর নেতৃত্ব দিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পড়াশোনায় তারা খুব একটা ভালো ছিল না এবং ইদানিং স্কুলেও যাচ্ছিল না। সম্প্রতি মা–বাবা তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার কমিয়ে দেন। কয়েক দিন ধরে ফোন ব্যবহার করতে না পারায় তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তাদের বাবা চেতন কুমার জানান, মেয়েরা ডায়েরিতে লিখেছে, “আপনি আমাদের কোরিয়ানদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমরা তাদের কতটা ভালোবাসি। কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়া আমাদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমরা এটা ছাড়তে পারব না।”
চেতন কুমার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমি জানতাম না এই গেমে এমন সব ভয়ানক টাস্ক থাকে। জানলে কোনও বাবাই তার সন্তানকে এসবের ধারেকাছে ভিড়তে দিত না। আমি অন্য সব বাবা-মাকে অনুরোধ করছি, সন্তানদের ভিডিও গেম খেলা থেকে দূরে রাখুন।”
উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নিমিশ প্যাটেল জানান, এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও গেমের নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধার করা সুইসাইড নোট ও ডায়েরির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, এই মর্মান্তিক ঘটনার সঠিক কারণ এবং পরিস্থিতির বিশদ তথ্য জানতে গভীর তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্যাটেল বলেন, “এই ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল তা নিয়ে তদন্ত এখনও চলমান। আমরা পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি রেকর্ড করছি এবং তাদের মোবাইল ফোনগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।”
গেমের উৎস কী এবং কেউ তাদের বাইরে থেকে নির্দেশ দিচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখছেন ঠিক কোন অ্যাপ বা গেমের মাধ্যমে এই বোনদের মগজধোলাই করা হয়েছিল।
গাজিয়াবাদের এই ঘটনা ব্লু-হোয়েল বা পাবজি আসক্তির ভয়াবহ স্মৃতি আবারও উসকে দিয়েছে।