নিজস্ব প্রতিবেদক
দানবীর হাজি মুহাম্মদ মোহসীনের স্মৃতিবিজড়িত মুড়ালি ইমামবাড়া ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর: ইতিহাসের পাতায় যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা, সেই দানবীর হাজি মুহাম্মদ মোহসীনের স্মৃতিবিজড়িত মুড়ালি ইমামবাড়া আজ অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। প্রায় দুইশ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির একটি বিশাল সীমানা প্রাচীর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিকট শব্দে ধসে পড়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি দেয়াল ধসে পড়া নয়, বরং যশোরের প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতির সংকেত হিসেবে দেখছেন ইতিহাসবিদ ও স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ মুড়ালি মোড় সংলগ্ন ইমামবাড়া এলাকায় এক বিকট শব্দ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই দেখা যায়, ইমামবাড়ার প্রাচীন প্রাচীরের একটি বড় অংশ ধসে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এবং আগাছার আক্রমণে জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এই কাঠামোটি আর ভার সহ্য করতে পারেনি। বর্তমানে প্রাচীরের বাকি অংশটুকুও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে অবশিষ্ট প্রাচীরটি পাশের পুকুরে ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত এই ইমামবাড়াটি হাজি মুহাম্মদ মোহসীনের বিশাল ওয়াকফ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি যশোর অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন। এর কারুকার্য এবং নির্মাণশৈলী ওই সময়ের আভিজাত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী বহন করে। যশোরের অন্যতম প্রধান ‘ল্যান্ডমার্ক’ হিসেবে পরিচিত এই ইমামবাড়াটি দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটক ও ইতিহাস গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে কোনো প্রকার সংস্কার না করায় দেয়ালগুলোতে নোনা ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেয়ালের ফাটলে বট ও অন্যান্য আগাছা জন্মানোর ফলে কাঠামোটি আরও ভঙ্গুর হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সংলগ্ন পুকুরটি সংস্কার না করায় পানির চাপে ও শ্যাওলায় দেয়ালের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ধসে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, এটি আমাদের শেকড় এবং ঐতিহ্যের অংশ। একে এভাবে বিলীন হতে দেওয়া যায় না। এলাকার সচেতন মানুষ দ্রুত ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে অবশিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সংস্কার করার দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে মূল ভবনসহ সম্পূর্ণ ইমামবাড়াটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রাচীর ও পুকুরের পাড় পুনর্নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মুড়ালি ইমামবাড়ার এই প্রাচীর ধস আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সময়ের সাথে সাথে আমরা আমাদের অমূল্য সম্পদগুলো হারিয়ে ফেলছি। জেলা প্রশাসন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যদি এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে অচিরেই যশোরের এই প্রধান ল্যান্ডমার্কটি কেবল ইতিহাসের বইয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। ঐতিহ্যের এই আর্তনাদ শোনার মতো কি কেউ নেই?