বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ যে ইতিহাস জানে না আজকের প্রজন্ম (পর্ব-২)

চাঁচড়া রাজবাড়ি: রাজা নেই, রাজ্য নেই, আছে শুধু ধূসর ইতিহাস

মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩ জানুয়ারি,২০২৬, ০২:১২ পিএম
চাঁচড়া রাজবাড়ি: রাজা নেই, রাজ্য নেই, আছে শুধু ধূসর ইতিহাস

❒ চাঁচড়া রাজবংসের শেষ স্মৃতিচিহ্ন শিব মন্দির ছবি: সংগৃহীত

রাজা নেই, রাজ্য নেই, রাজবাড়িও নেই। আছে কয়েকটি মন্দির, রাজবাড়ির পরিত্যক্ত দুটি বাড়ির ভগ্নাংশ এবং বিক্ষিপ্ত কয়েকটি জলাশয় ও কিছু ইট, কাঠ ও পাথর। জলাশয়গুলো ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। মন্দিরগুলোর মধ্যে মাত্র একটি মন্দির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে; বাকিগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই নিদর্শনগুলোর সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। বাংলাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ প্রত্নসম্পদ চাঁচড়ার এই রাজবাড়িটি। এই রাজবংশের একটি উজ্জ্বল প্রদীপ ছিলেন রাজা বরদাকান্ত রায়। যশোরে তাঁর নামে ‘রাজা বরদাকান্ত রোড’ ছাড়া আর কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। একজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে দ্বিজাতি তত্ত্বের উদ্ভব এবং তারপর হিন্দু-মুসলিমের দেশ ভাগাভাগি—পরিণামে যশোর শহরের বহু অভিজাত হিন্দু পরিবারের কলকাতায় গমন—আমাদের স্থানীয় ইতিহাস চর্চায় চরম দৈন্যের দিকটি পরিলক্ষিত হয়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ধারণা ও গুরুত্ব উপলব্ধির অভাব থাকায় বহু বনেদি হিন্দু-মুসলিম পরিবারের পরিচয় আমাদের জ্ঞানের উৎসকে সংকুচিত করেছে। চাঁচড়ার রাজাদের বংশধরেরা এখন কে কোথায় আছেন, তা আর জানার কোনো সুযোগ নেই। সতীশচন্দ্র মিত্র কিছু বিক্ষিপ্ত তথ্য উপস্থাপন করলেও তারা এখন আর এদেশের কোথাও বসবাস করছেন বলে মনে হয় না। কারণ তাঁদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময় ভারতে গমন করে কলকাতাসহ বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস গড়ে তুলেছেন। তাঁদের পরিচয় উদ্ধার হলে আমাদের স্থানীয় ইতিহাস চর্চা সমৃদ্ধ হতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

খসে পড়া রাজবাড়ি     সংগৃহীত

যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চলে কিছু বনেদি ও ঐতিহ্যবাহী হিন্দু-মুসলিম পরিবার রয়েছে, ইতিহাসে যাঁদের স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু গবেষণা পরিচালনা করার সময় দেখা যায় তথ্যগুলো সবই কলকাতায়। জাতি শিক্ষিত হলেও পরিবারের মধ্যে ইতিহাস চর্চায় অনীহা এবং তেমন অনুসন্ধিৎসু লোক তৈরি না হওয়ায় সমৃদ্ধ সে ইতিহাস হারিয়ে যেতে বসেছে।

চাঁচড়া রাজবাড়ির আদি স্থপতি গণ্য করা হয় রাজা কন্দর্প রায়কে। কন্দর্প রায়ের পিতা মহতাবরাম মোগলদের বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন। মোগল সেনাপতি মানসিংহ যখন সসৈন্যে বিদ্রোহী প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যশোরে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন বিশ্বস্ত কর্মচারী হিসেবে তিনি মানসিংহকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। প্রতাপের পরাজয় এবং সন্ধির ফলে মহতাব ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত হন। ধীরে ধীরে যশোর রাজ্যের অধিকাংশ পরগনা মহতাবের বংশধরদের হস্তগত হয়। নুরনগর রাজবংশের পতনের পর তাঁর বংশ ‘যশোরের রাজা’ বলে স্বীকৃতি লাভ করে। রাজা বরদাকান্ত রায় এই বংশের নবম এবং সর্বশেষ রাজা বলে খ্যাতি লাভ করেন।

রাজা বরদাকান্ত রায় ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল রাজা বাণীকান্ত রায় (১৮০২-১৮১৭)। রাজা বরদাকান্ত রায়ের বয়স যখন তিন বছর, তখন তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। বরদাকান্ত রায় চতুর, বুদ্ধিমান এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তাঁর লেখাপড়া জীবন সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না; তবে তিনি যে শিক্ষানুরাগী ছিলেন তা অনুমেয়। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে জেলার একমাত্র সরকারি স্কুল ‘যশোর জেলা স্কুল’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ছিল। স্কুল প্রতিষ্ঠায় ৮৭ জন দাতা সদস্যের নাম পাওয়া যায়। রাজা বরদাকান্ত রায় ৪০০.০০ (চারশত) টাকা দিয়ে এই তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তার পূর্বে এই অঞ্চলে জনগণের শিক্ষার জন্য রাজাদের সহযোগিতায় কোনো স্কুল প্রতিষ্ঠার তথ্য পাওয়া যায় না। টোল জাতীয় সংস্কৃতবহুল পাঠ্যব্যবস্থার প্রচলন ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া গেলেও তা একান্তই ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হতো। তবে জেলায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে বহু তথ্য পাওয়া যায়। অভয়নগর, লেবুতলা, যশোরের কালী মন্দির, সোনাদিয়ার বিখ্যাত মন্দিরসহ বহু মন্দির এই আমলেই প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে জানা যায়।

এই সময় যশোরের কালেক্টর ছিলেন মি. টুকার। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল বোর্ড অব রেভিনিউ-এর নিকটে মি. টুকারের লেখা একটি চিঠি থেকে চাঁচড়ার এই রাজবংশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। রাজা শুকদেব রায় (১৭২৯-১৭৪৫), রাজা নীলকান্ত (১৭৪৫-১৭৬৪) ও রাজা শ্রীকান্ত রায় (১৭৬৪-১৮০২)—তিনজনই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। এই সময় অজস্র দেবোত্তর, ব্রহ্মোত্তর ও রাজার রাজোচিত উৎসব-অনুষ্ঠান পরিচালনায় যথেষ্ট অর্থ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রমে ক্রমে এই বংশের পতন ত্বরান্বিত হয়। টুকারের চিঠি থেকে জানা যায় এই সময় (১৭৮৪ খ্রি.) রাজা শ্রীকান্ত রায়ের প্রকাশ্য ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) টাকা। তবে যে রাজা বার্ষিক তিন লক্ষ টাকা রাজস্ব দেন, তাঁর পক্ষে এ ঋণ সামান্য বটে। কিন্তু পূর্বোক্ত কারণে আয় সংক্ষেপ হওয়ায় সামান্য ঋণও ক্রমে বেড়ে যায়। মূলত জমিদারি বন্দোবস্তের নতুন নিয়মে রাজপরিবারটি একেবারে নিঃস্বে পরিণত হয়। টুকার সাহেব এজন্য রাজপরিবারের প্রতি সদয় হন; এমনকি এ অবস্থা দেখে ইংরেজ শাসননীতির ওপর কটাক্ষ করতেও ছাড়েন নাই। এই অবস্থায় তাঁর প্রচেষ্টায় চাঁচড়ার জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের হস্তে চলে যায় এবং রাজপরিবারের বার্ষিক খরচের জন্য ৬০০০.০০ (ছয় হাজার) টাকা রেখে অবশিষ্ট লভ্য থেকে দেনা ও জমিদারির উন্নতি সাধনের জন্য সুব্যবস্থা গৃহীত হয়। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেলের আদেশে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের নববিধানানুসারে বেআইনি নিলাম প্রমাণিত হওয়ায় সাহস পরগনার কতকাংশ রাজার হস্তগত হয়। এছাড়া পরগনা ইমাদপুর, সৈয়দপুর ও সাহস পরগনায়ও রাজাদের ভূসম্পত্তি ছিল। ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা বরদাকান্ত রায় বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে জমিদারি নিজ হস্তে গ্রহণ করেন এবং ৪৬ বৎসরকাল নিরুদ্বেগে শাসন পরিচালনা করে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত সিপাহি বিদ্রোহের সময় যশোর, ফরিদপুর এবং পাবনায় ওহাবিদের জোরালো তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। ওহাবিদের অধিকাংশই ছিল কৃষক এবং তারা মুসলমান। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৮৫৭-এর পূর্বে ভারতবর্ষে বহু ছোটখাটো বিদ্রোহ পরিচালিত হয়েছে, কিন্তু এটি ছিল প্রথম সর্বভারতীয় মহাবিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে ইংরেজরা অস্তিত্ব সংকটে পতিত হয়। এই সময় এদেশের প্রতিষ্ঠিত বড় বড় জমিদারগণ ইংরেজদের পাশে এসে দাঁড়ান। পরিণতিতে এই মহাবিদ্রোহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। স্বাভাবিকভাবে এই সময় যশোরের রাজা বরদাকান্ত রায় দেশের অন্যান্য জমিদারদের ভূমিকার ন্যায় ইংরেজদেরকে হাতি ও নানাবিধ যানবাহনের সাহায্যে রাজভক্তির পরিচয় দেন। এরপর তিনি ইংরেজের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে জনকল্যাণে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকারের নিকট থেকে ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন।

রাজা বরদাকান্ত রায় হিন্দু-মুসলিম উভয় শ্রেণির কাছে একজন জনপ্রিয় রাজা ছিলেন বলে অনুমান করা যায়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে সতীশচন্দ্র মিত্র তার একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। ইংরেজ বাহাদুর কর্তৃক বরদাকান্ত রায়ের প্রাপ্ত উপাধি এবং তাঁর কাজের প্রশংসা করে বাংলা ১৩০৪ সালে (১৮৯৭ খ্রি.) লিখিত একটি ক্ষুদ্র কবিতা পুস্তকের কথা উল্লেখ করেছেন। এই পুস্তিকাটির লেখক ছিলেন একজন মুসলিম। তাঁর নাম জসিমুদ্দিন বিশ্বাস। পুস্তিকাটির নাম ছিল ‘চাঁচড়া চন্দ্রিকা’। উল্লেখ্য, জসিমুদ্দিন কে ছিলেন, কোথায় তাঁর জন্ম-পরিচয়—কিছুই উদ্ধার করা এখন আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু যশোরের ইতিহাস রচনায় তাঁর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যে বিফল হয়নি, সতীশচন্দ্রের মতো একজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাঁর তথ্য ব্যবহার করে ইতিহাস প্রণয়ন করেছেন, এটাই তার সাফল্য।

রাজা বরদাকান্ত রায়ের মৃত্যুর ১৭ বছর পর ‘চাঁচড়া চন্দ্রিকা’ পুস্তিকাটি লেখা হয়। আধুনিক ইতিহাস গবেষণায় রাজা বরদাকান্ত রায়কে দেওয়া উপাধিপত্রের তথ্যটি ব্যবহার করা হয়েছে তৎকালীন যশোরের কালেক্টরের লেখা চিঠিপত্র থেকে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহের নানা তথ্য এবং জেলার সাধারণ মানুষ ও জমিদারদের ভূমিকা নিয়ে তখন নদীয়ার কমিশনারের নিকট নিয়মিত হাতে লেখা চিঠিপত্র সরবরাহ করা হতো। ‘১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ (ইফা, গবেষণা বিভাগ, প্রকাশকাল-২০০৩) গ্রন্থটি প্রণয়ন করার সময় প্রবন্ধকার যশোরের কালেক্টরেট ভবনের মুহাফেজখানায় সংরক্ষিত এ ধরনের কিছু হাতে লেখা চিঠিপত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। বর্তমানে তার অধিকাংশই ঢাকা আর্কাইভসে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। রাজা বরদাকান্ত রায়কে নিয়ে তথ্যটির উল্লেখ পাওয়া যায় নদীয়ার কমিশনারের নিকট যশোরের কালেক্টরের পত্র (২৬শে এপ্রিল, ১৮৫৮), যশোর জেলা কালেক্টরেট রেকর্ডস প্রেরিত পত্র, ভলিউম ৪৩৩, পত্র সংখ্যা ৭৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রতন লাল চক্রবর্তী তাঁর ‘সিপাহী যুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি প্রণয়নের সময়ও এই তথ্যটিই ব্যবহার করে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জেলাভিত্তিক ‘যশোর জেলা’র ইতিহাস অংশটুকু প্রণয়ন করেছেন।

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,

সরকারি নুরুন্নাহার মহিলা কলেজ, ঝিনাইদহ।  ০১৭২৫-৫৫৫৯৩৯।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)