বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ যে ইতিহাস জানে না যশোরের মানুষ (পর্ব-১)

যশোর উকিল বারের দেড়শ বছর : বিস্মৃতির অতলে প্রথম মুসলিম আইনজীবীরা

মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর,২০২৫, ০৩:০৬ পিএম
যশোর উকিল বারের দেড়শ বছর : বিস্মৃতির অতলে প্রথম মুসলিম আইনজীবীরা

❒ যশোর আইনজীবী ভবনের রাতের ছবি ছবি: সংগৃহীত

১৭৮৩ সালে কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয় এবং উইলিয়াম জোন্স তার প্রথম বিচারপতি নিযুক্ত হন। এর ১০০ বছর পর ১৮৮৪ সালে যশোর ‘উকিল বার’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সময় (১৮৩৭ সালে ইংরেজি ভাষা প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত) আদালতে আরবি-ফারসি ভাষার প্রচণ্ড দাপট ছিল। এখনও আদালতে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব বিদ্যমান। উইলিয়াম জোন্স বাংলায় এসেই প্রথম আরবি-ফারসি ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করেন এবং এদেশীয়দের লেখা বহু বই ইংরেজিতে অনুবাদ করে দুই প্রাচ্যের মধ্যে জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ১৭৮৪ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিরও তিনিই ছিলেন প্রথম প্রতিষ্ঠাতা। ভারতীয়রা তাই উইলিয়াম জোন্সের কাছে বিশেষভাবে ঋণী।

যশোরের মুড়লী একটি ঐতিহাসিক স্থান। মধ্যযুগে এটি ছিল একটি জনবহুল জনপদ। সে সময় মুসলিম প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক হযরত খান জাহান আলী বারোবাজার থেকে ভৈরব নদী ধরে মুড়লীতে অবস্থান করেছিলেন। এখান থেকেই তাঁর একটি বাহিনী বাগেরহাট এবং অন্যটি কপোতাক্ষ নদ ধরে সুন্দরবনে উপনীত হয়। এখানে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত আদালত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইংরেজ কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণের পর মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব যেমন হ্রাস পায়, ঠিক তদ্রূপ মুড়লীরও গুরুত্ব হ্রাস পায়। সম্ভবত মুসলিম জনবহুল এলাকায় অবস্থান করাটা তারা নিরাপদ মনে করেনি বলেই আদালত ব্যবস্থা প্রথমে পুরাতন কসবায় ও পরে ১৮০১ সালে বর্তমান কালেকটরেট ভবনে স্থানান্তরিত হয়। পুরাতন কসবার আরেক নাম সাহেবগঞ্জ। এখানে ইংরেজদের আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে এই নামকরণ হলেও পরবর্তীতে এই নামটি পরিত্যাগ করা হয়। পিটারসন নামে একজন ইংরেজের (পাদ্রি) নামে এখানে একটি সড়কের নামকরণ পরিলক্ষিত হয়।

যশোর উকিল বারের প্রথম মুসলিম উকিল ছিলেন মরহুম সৈয়দ মজিদ বক্স। তিনি ১৯১৯ সালে এই বারে যোগদান করেন এবং প্রায় চল্লিশ বছর এই পেশায় নিযুক্ত থেকে ১৯৬৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমান উকিল বারের পাশেই তাঁর ক্ষয়িষ্ণু বাসভবনের চিহ্ন বিদ্যমান। তিনি কেশবপুরের ঐতিহাসিক স্থান মির্জানগরের বাসিন্দা ছিলেন। রিয়াজ-এর অনুবাদক মৌলভী আব্দুস সালাম এর ‘মাসির উল উমারা’ থেকে তথ্য ব্যবহার করে সতীশচন্দ্র মিত্র ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’ (পৃ-৩১৩) গ্রন্থে মির্জানগরের বাসিন্দা হিসেবে মরহুম মৌলভী সৈয়দ আবুল ফজল মোনায়েম বক্স নামে একজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন। ১৬৪৯ সালে মির্জা সাফসিখান মোগলদের ফৌজদার নিযুক্ত হয়ে এই স্থানে তাঁর কেল্লাবাড়ি নির্মাণ করেন। তিনি এখানেই সপরিবারে বসবাস করতেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মাজারও এখানে বিদ্যমান। সেই থেকে উক্ত গ্রামের নামকরণ মির্জানগর এবং ১৮০০ সাল পর্যন্ত এখানে উক্ত বংশের বসবাস এবং প্রভাব বিদ্যমান ছিল বলে ‘মাসির উমারা’ গ্রন্থে তার ইঙ্গিত বিদ্যমান। মরহুম মজিদ বক্স কত সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁর লেখাপড়া কোথায় ছিল এ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। মির্জানগর একটি ঐতিহাসিক স্থান। মোগল আমলের প্রশাসনিক দপ্তর ছিল এই স্থানটি। তাঁদের স্মৃতি চিহ্ন হাম্মামখানা এখনো সেখানে বিদ্যমান। সুতরাং এই অঞ্চলে অভিজাত পরিবারের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। সম্ভবত মৌলভী সৈয়দ আবুল ফজল মোনায়েম বক্স-এর কেউ হবেন সৈয়দ মজিদ বক্স। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা হলে যশোরের আঞ্চলিক ইতিহাস সমৃদ্ধ হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

দ্বিতীয় জনের নাম মরহুম সৈয়দ নওশের আলী (যোগদান-১৯১৯ এবং মৃত্যু-১৯৭২)। তৃতীয় মুসলিম উকিল ছিলেন তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল। উনিশ শতকের শেষ দশকে তিনি ঝিকরগাছা থানাধীন হাজিরবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯২১ সালে বি এল পাস করে আইন ব্যবসায় নিযুক্ত হন। ঠিক এই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে একই এলাকার (পানিসারা গ্রাম) কৃতি সন্তান বিখ্যাত ‘শিখা’ পত্রিকার সম্পাদক আবুল হুসেন (১৮৯৫-১৯৩৮) ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগে যোগদান করে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯২৭ সালে বি এল এবং ১৯৩১ সালে এম এল ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এম এল ডিগ্রিধারী ব্যক্তিত্ব। ঝিকরগাছার অমৃতবাজার মাগুরার কৃতি সন্তান শিশির কুমার ঘোষের (১৮৪০-১৯১১) পিতা হরিনারায়ণও এক সময় যশোরে আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন এবং অন্যতম উকিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। হরিনারায়ণ বিয়ে করেছিলেন কালীগঞ্জ থানার অন্তর্গত নলডাঙ্গার তেলেন গ্রামের জয়চন্দ্র বসুর কন্যা অমৃতময়ীকে। ঝিকরগাছার একটি প্রসিদ্ধ স্থান ‘অমৃতবাজার’ তাঁর নামেই নামকরণ করা হয় বলে জানা যায়। হরিনারায়ণ আরবি-ফার্সিতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। জেলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডাইরেক্টরি-২০১৭’ স্মরণিকায় শিশির কুমার ঘোষের পিতা হরিনারায়ণের নাম পাওয়া যায় না। এই নলডাঙ্গার জমিদারদের অধীনে এক সময় চাকরি করতেন আবুল হুসেনের দাদা আবুল হাশিম।

উনিশ শতকে যশোরের ঝিকরগাছায় বসবাসরত লেখক সাংবাদিক ময়েজউদ্দিন আহমদ (১৮৫৫-১৯২০-জন্ম হাওড়া, ভারত), শিশির কুমার ঘোষ (১৮৪২-১৯১১) এবং আবুল হুসেন (১৮৯৫-১৯৩৮) বাংলার জাতীয় জাগরণে তাঁদের স্ব-স্ব পেশায় যে অবদান রেখেছিলেন ইতিহাসের পাতায় তা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে তখনকার দিনে এই স্থানের পরিচিতি ছিল শহর থেকে বহু দূরে একটি গণ্ডগ্রাম হিসেবে। শিশির কুমার সম্পাদিত তাঁর “অমৃত বাজার” পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (২০ ফেব্রুয়ারি-১৮৬৮) এই স্থানটির পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: “যে স্থান হইতে এই পত্রিকা বাহির হইতেছে, তাহার পশ্চিমে ও উত্তরে তিন দিনের পথ, পূর্বে দেড় বছরের ও দক্ষিণে তিন বৎসরের পথ পর্যন্ত একটিও মুদ্রাযন্ত্র নাই, সুতরাং সংবাদপত্র থাকাও অসম্ভব।’’ এই তিন কৃতি সন্তানের কর্মস্থল দুই স্থানের সাথে সমভাবে সম্পৃক্ত—ঝিকরগাছা ও কলকাতা। তখন বাংলাদেশের অন্যান্য যে কোনো শহর থেকে ঝিকরগাছা ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী একটি থানা শহর এবং এখান থেকে ট্রেনে খুব স্বল্প সময়ে কলকাতায় পৌঁছানো যেত। কিন্তু তাঁদের মধ্যকার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া না গেলেও সমসাময়িক এবং একই স্থানে চার জনের বসবাস ও কর্মস্থল (সাংবাদিকতা) কলকাতায় অবস্থান প্রমাণ করে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তা সুধীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি।

শিশির কুমার তাঁর মায়ের নামেই (অমৃতময়ী দাসী) গ্রামটির নামকরণ করেন অমৃত বাজার। এই স্থানটি বর্তমান যশোর জেলাধীন ঝিকরগাছা থানার অমৃত বাজার মাগুরা গ্রামটিই নির্দেশ করে। এখনো এখানে তাঁদের ভিটেবাড়ির চিহ্ন, দাতব্য চিকিৎসালয়, প্রেসের স্থান ও স্নানাগার বিদ্যমান। এই স্থানগুলি এখন ধ্বংসের পথে। ১৮৭৯ সালে সপরিবারে শিশির কুমার কলকাতায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। ঠিক এই সময়ের কিছুদিন পরে ‘প্রচারক’ (১৮৯৯) পত্রিকার সম্পাদক ময়েজউদ্দিন আহমদ অমৃতবাজার ডাকঘরের অধীন আজমপুর গ্রামে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন এবং এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। মুক্ত চিন্তা ও বুদ্ধি আন্দোলনের পুরোধা “শিখা” পত্রিকার সম্পাদক আবুল হুসেনের জন্মও এই ঝিকরগাছায় ১৮৯৫ সালে। তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় আধুনিক সংস্কারের কথা তুলে ঢাকার নবাব পরিবারের বিরাগভাজনে পরিণত হন এবং ঢাকা ছেড়ে পুনরায় কলকাতায় ফিরে যান। ময়েজউদ্দিন আহমদও ধর্মীয় শিক্ষার সমালোচনা করে ‘প্রচারক’-এ প্রবন্ধ প্রকাশ করতেন। এই তিন পথিকৃৎ সাংবাদিক উনিশ শতকে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের ভেতরে জাতীয় জাগরণের যে বীজ বপন করেছিলেন, তারই ফলে এক সময় ভারতবাসীর হৃদয়ে জাতীয় জাগরণের সূত্রপথ সূচিত হয় এবং বাংলা ভাষী জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে অনুপ্রাণিত হয়। বলতে গেলে বাংলাদেশের ভূতপূর্ব অনেক খ্যাতনামা কবি লেখক সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছিল এই তিন পত্রিকা ‘প্রচারক’, ‘অমৃত বাজার’ ও ‘শিখা’র মধ্য দিয়ে। বাংলার সাংবাদিক জগতের ইতিহাসেও তাঁরা চিরদিন পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন। তাঁদের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণায় এ অঞ্চলের মানুষ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসে। ঠিক এই সময়ে আর একজন কৃতি সন্তান তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল ১৮৮৯ সালে ঝিকরগাছার হাজিরবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন যশোরের তৃতীয় মুসলিম উকিল। পূর্বে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত কোনো মুসলমান সন্তানের পক্ষে এই ডিগ্রি অর্জন করা তেমন সম্ভব ছিল না। মুসলমানরা প্রায় এক শতাব্দী পর্যন্ত শিক্ষা-দীক্ষায় হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে ছিল। এ সময় যশোরে কোনো মুসলিম উকিলের সন্ধান ছিল না। হিন্দু উকিলদের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হতো। তছিরউদ্দিন আহাম্মদের পিতা দিরাজতুল্লাহ সরদার সমাজ সচেতন এবং মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতির দুরাবস্থা উপলব্ধি করেই পুত্রকে বি এল পড়ার সুযোগ করে দেন। তাঁর আগে ঝিকরগাছানিবাসী আবুল হুসেন এই ডিগ্রি অর্জন করে মুসলমানদের গৌরব বৃদ্ধি করেন।

বিচারপতি লতিফুর রহমান তাঁর স্মৃতিচারণমূলক রচনা ‘‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলি ও আমার কথা’’ গ্রন্থে তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল এর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন—আমার পিতা খানবাহাদুর লুৎফর রহমান (মৃত্যু ১৯৮১) যশোর জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র ছাত্র ছিলেন। জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতা থেকে রিপন কলেজ থেকে আইন শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। ৩০ মে ১৯২৩ সালে জেলা আদালতে আইন ব্যবসায় যোগদান করেন। তাঁর ভাষায়—আমার পিতা যখন আইন ব্যবসায় যোগদান করেন তখন তিনিসহ মাত্র দু’জন মুসলিম আইনজীবী যশোর বারে ওকালতি করতেন। এ দু’জনের অপরজন ছিলেন অ্যাডভোকেট তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল। তিনি আমার পিতার মৃত্যুর আগে মৃত্যুবরণ করেন। আমার পিতা যখন আইন ব্যবসায় যোগদান করেন তখন তিনি সমসাময়িককালে অনেক প্রতিষ্ঠিত হিন্দু উকিলদের সাথে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং এই পেশায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এ সময় যোগেন বোস, সুকুমার মুখার্জি ও চন্দ্রকুমার ব্যানার্জীর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।’’ যশোর জেলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক স্মরণিকা ‘ডাইরেক্টরি-২০১৭’ প্রকাশিত তথ্যে খানবাহাদুর লুৎফর রহমানের আগে আরও দু’জন মুসলিম উকিলের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন মরহুম সৈয়দ মজিদ বক্স (মৃত্যু-১৯৬৩)। দ্বিতীয় জনের নাম সৈয়দ নওশের আলী (অবিভক্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের স্পিকার)। তাঁর যোগদান তারিখ উল্লেখ আছে ১৯২৩ সাল। মৃত্যু ১৯৭২। উল্লেখ্য এই স্মরণিকায় উকিল তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল-এর কোনো নাম উল্লেখ নেই। সুতরাং খানবাহাদুর লুৎফর রহমানের আগে যশোর বারে অন্ততপক্ষে আরও তিন জন উকিলের তথ্য জানা গেলেও একমাত্র তছিরউদ্দিন আহাম্মদ ছাড়া আর কারও জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। যশোর জজকোর্ট মসজিদ সংলগ্ন প্রতিষ্ঠিত উকিলবাড়ি বলতে তছিরউদ্দিন আহাম্মদ প্রতিষ্ঠিত উকিলবাড়িই নির্দেশ করা হয়। এখনো সেখানে একটি শিলালিপিতে ‘তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল উকিল, জানুয়ারি-১৯২২, উকিলবাড়ি স্থাপিত-১৯২৩’’ উল্লেখ পাওয়া যায়। এই স্মরণিকায় যশোর উকিলবারে প্রথম যোগদানকারী হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু এই তথ্যটি কখনই সঠিক নয়। তাঁর জীবনী সম্পর্কে যে সব গবেষণা পরিচালিত হয়েছে, সেখানে এই তথ্যের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। স্মরণিকায় তাঁর যোগদান তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৪৪। অথচ যশোর বার তখনো স্থাপিতই হয়নি। আর তিনি বিলেতেও পাড়ি দেননি, ব্যারিস্টারিও পাস করেননি। তাঁর ইউরোপ জীবন শুরু হয়েছিল ১৮৬২-১৮৬৬ সাল পর্যন্ত। ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৮৭৩ সালে। যশোর বার স্থাপিত হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। সুতরাং তিনি যশোর বারে কখনই যোগদান করেননি। রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার এই বারে ১৮৮৮ সালে যোগদান করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে। যশোর বার স্থাপিত হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। তাই কে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আর কে প্রথম দিকে এখানে যোগদান করেছিলেন—সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে মি. টিলম্যান হেঙ্কেল ১৭৮৬ সালের দিকে যশোরের প্রথম কালেক্টর এবং ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তখন আদালত ছিল মুড়লীতে। ১৭৯৩ সালে মুড়লী থেকে কসবায় এবং ১৮০১ সালে বর্তমান কালেকটরেট ভবনে বিচার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ সালে কলকাতায় সম্পাদিত ‘সলেমানপুর ওয়াকফ এস্টেট’ দলিলে তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল এর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। এই এস্টেটের (কোটচাঁদপুর) স্বত্বাধিকারী মরহুম আব্দুল গফুর সরদারের কবর গাত্রের শিলালিপির তথ্য অনুসারে তিনি (আব্দুল গফুর) ছিলেন এই ওয়াকফ সম্পত্তির প্রথম মোতাওয়াল্লী। কবর গাত্রে দ্বিতীয় মোতাওয়াল্লী হিসেবে ঝিকরগাছা থানার হাজিরবাগ গ্রামনিবাসী মৌলভী তছিরউদ্দিন আহাম্মদ (বিএল)-এর নাম উল্লেখ করা হয়। তিনি আব্দুল গফুরের কনিষ্ঠ জামাতা। তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল ঝিকরগাছা থানার হাজিরবাগ গ্রামে ১৮৮৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পিতার নাম দিরাজতুল্লাহ সরদার। দিরাজতুল্লাহ সরদারের অপর সন্তান নাছিমউদ্দিন সরদারের সন্তান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর মুক্তিযোদ্ধা আবুল ইসলাম সরদার এমপি (১৯২৩-২০০৪)। তছিরউদ্দিন আহাম্মদ যশোর জিলা স্কুল থেকে ১৯১০ সালে এন্ট্রান্স (এসএসসি), ১৯১৩ সালে বঙ্গবাসী কলেজ, কলকাতা থেকে এফ এ (এইচএসসি) এবং ১৯১৬ সালে বিএ ও ১৯২১ সালে বিএল পাস করে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। তিনি ১৯২২ সালে ‘প্রথম মুসলিম’ উকিল (আইনজীবী) হিসেবে যশোর উকিলবারে যোগদান করেন এবং ১৯২৩ সালে যশোর স্টেডিয়াম সংলগ্ন ৫/১ ‘উকিল বাড়ি’ প্রতিষ্ঠা করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। তাঁদের নাম রওশান জাহান, রেজাউল করিম ও আমিরুল করিম। এঁদের মধ্যে রেজাউল করিম জীবিত বলে জানা যায়। আমিরুল করিমের এক সন্তান মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস (তপু) বর্তমান জজকোর্ট, যশোরে আইন পেশায় নিযুক্ত।

শত চেষ্টা করেও আব্দুল গফুরের কবর গাত্রে স্থাপন করা শিলালিপিটি স্থাপনকারীর নাম এবং উজির আলীর সমাধি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তছিরউদ্দিন আহাম্মদ একজন বি এল (ব্যাচেলর অব ল) ডিগ্রিধারী উচ্চ শিক্ষিত, ধার্মিক, ইতিহাস সচেতন এবং কবি ছিলেন বলে মনে হয়। কবর গাত্রে পয়ার ছন্দে লিখিত উজির আলী সম্পর্কে ছয় লাইনের যে কবিতা সংরক্ষিত আছে সম্ভবত তা তছিরউদ্দিন আহাম্মদের লেখা বলে মনে হয় অথবা অন্যের দ্বারাও তা লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কবর গাত্রে সংরক্ষিত শিলালিপিটি তাঁর ইতিহাস সচেতনতার প্রমাণ বহন করে। পরিবারে ‘শেরশাহ’ নামে এছাড়াও আরও কয়েকটি তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা যায়। সম্ভবত শিলালিপিটি তাঁর দ্বারাই স্থাপিত। মোতাওয়াল্লী আরবি শব্দ। এর অর্থ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সাধারণত ওয়াকফ সম্পত্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আরবিতে ‘মোতাওয়াল্লী’ নামে অভিহিত করা হয়।

আব্দুল গফুরের কবর গাত্রে সংরক্ষিত শিলালিপিতে ‘দাতা উজির আলী’ সম্পর্কে ছয় লাইন কবিতাকারে তাঁর দানের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। বলা হয়েছে:

‘‘স্বনামে পুরুষ ধন্য দাতা উজিরালী সোদর আব্দুল গফুর আর কায়েম আলী স্থাপিলা ওয়াকফ এস্টেট পরহিত তরে নিদ্রিত মধ্যম তার ইহারি গহবরে কালজয়ী দান যাদের, হে খোদা মহান দীপ্ত হক তবে নূরে, তাদের বয়ান।’’

এই কবিতানুসারে উপলব্ধি করা যায় যে, উক্ত গোরস্থানে কোথায় উজির আলীর সমাধি ছিল তা চিহ্নিত করা যায়নি। ০৯/১২/২০১৬ তারিখেও প্রবন্ধকার (ফারাসাতপুর, ঝিকরগাছা, যশোর) কর্তৃক শত চেষ্টা করেও উজির আলীর কবর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে শিলালিপিটি মরহুম উজির আলীর সমাধির পরিবর্তে মরহুম আব্দুল গফুরের সমাধিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

কবিতার ভাব ভাষা উভয়ই স্পষ্ট। তাঁরা আজ পৃথিবীতে নেই, কিন্তু একটি ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। তেমনি তাঁদের দান, তাঁদের মাহাত্ম্য হারিয়ে যায়নি। একটি শতাব্দী অতিক্রম করে আজ দ্বিতীয় শতাব্দীতে যাত্রা শুরু করেছে। প্রভুকে খুশি করার উদ্দেশ্যে তাঁদের রেখে যাওয়া এই উন্নত স্মৃতি তাঁদের অক্ষয় কীর্তি ঘোষণা করছে। তাঁদের দানে অন্ধকার সমাজ আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। মহৎ উদ্দেশ্য আজ সফলতার উচ্চ শিখরে উপনীত। কুরআনের ভাষায় ‘যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা ঊর্ধ্বে বিস্তৃত। যা প্রত্যেক মৌসুমে ফল দান করে তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে—এই উপমা মানুষের শিক্ষার জন্য।’ আজ এই দানে শত শত মানুষ নিজেরা আলোকিত হয়ে যুগের পর যুগ নতুন প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে পরকালে মুক্তির সন্ধান লাভ করেছে। ধর্মীয় শিক্ষার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে বিশাল আয়তনে প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘উজির আলী মাদ্রাসা’ আজ ‘উজির আলী হাই স্কুল এন্ড কলেজ’-এ রূপান্তরিত হয়ে তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছে। ভালো কাজে নিজেকে জড়িত করার কারণে এই সাথে উকিল তছিরউদ্দিন আহাম্মদ বি এল এর নামও আজ ইতিহাসের পাতায় চির স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ। সরকারি নুরুন নাহার মহিলা কলেজ, ঝিনাইদহ।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)