এম জামান
যশোরের হাটখোলা রোডের আর কে লাইন হাউস ছবি: ধ্রুব নিউজ
দোকানের নাম ‘আর কে লাইট হাউজ’। কিন্তু লাইট বলতে এ প্রজন্ম সাধারণত যে বৈদ্যুতিক বাল্ব, টিউবলাইট কিংবা নিয়ন আলোর ঝলকানি বোঝে—তার কিছুই পাওয়া যায় না এখানে। যশোর শহরের হাটখোলা রোডের এই দোকানে ঢুকলে দেখা মিলবে এখনো সগৌরবে টিকে আছে আমাদের ঐতিহ্যের আলোকযন্ত্র। আধুনিক আলোকোজ্জ্বল নগরে প্রযুক্তির জোয়ারে আজ সেসব প্রদীপের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির আলো এখনো নিভেনি। আধুনিকতার এই ব্যস্ত সময়েও অতীতের এক টুকরো ইতিহাস বুকে নিয়ে সচল রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী আলোর ঘর। দোকানটিতে ঢুকলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে সারি সারি ঝুলতে থাকা বিভিন্ন আকৃতির হারিকেন ও হ্যাজাক লাইট। শুধু আস্ত বাতিই নয়, এগুলো সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচ, সলতে, বার্নার কিংবা নাট-বল্টুর মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যন্ত্রাংশও মিলবে এখানে। যেখানে পুরো দেশ আধুনিকতায় রূপান্তর হয়েছে, সেখানে এই দোকানটি যেন এক জীবন্ত জাদুঘর।
একসময় বাংলার প্রতিটি গৃহস্থালির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল হারিকেন। সাঁঝ নামলেই ঘরে ঘরে শুরু হতো এক চেনা আনুষ্ঠানিকতা—কেরোসিন ভরা, কাঁচ পরিষ্কার করা আর সলতে উসকে দিয়ে আলো জ্বালানো। সেই মৃদু আলোয় চলত গ্রামীণ শিশুদের পড়াশোনা, মা-বোনেদের রান্না আর উঠোনে বসে বুড়োদের রূপকথার আসর। বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাতের একমাত্র নির্ভরতা ছিল এই হারিকেন। কিন্তু সময়ের আবর্তনে দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এখন পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। লোডশেডিংয়ের অন্ধকার তাড়াতেও এখন জায়গা করে নিয়েছে রিচার্জেবল ইমার্জেন্সি লাইট, টর্চ কিংবা সৌরবিদ্যুৎ। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে হারিকেন এখন কেবলই গল্প বা ছবির বিষয়।
ব্যবসায়িক দিক থেকে লাভজনক না হলেও কেবল পুরোনো ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে এই ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন আর কে লাইট হাউসের স্বত্বাধিকারী গোপাল চন্দ্র পাল। তার আদিবাড়ি ঝিনাইহদের শেলকূপা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকায় থাকতে না পেরে যশোরে আসেন। শুরু করেন আলোক যন্ত্রের ব্যবসা। তার এ দোকানের বয়স ৫৩ বছর।
ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র পাল জানান, আগে প্রতিটি বাড়িতেই হেরিকেন ছিল। এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় মানুষ আর ব্যবহার করে না। তবুও দোকানে রাখি। মাসে দুই-চারটি বিক্রি হয়, আবার অনেক মাসে তেমন বিক্রিও হয় না।
তিনি জানান, ঢাকাতে দুএকটি কারখানা এখনো আছে। তারা এসব জিনিস তৈরি করে, তাদের কাছ থেকে এই মাল সংগ্রহ করা হয়।
পুরোনো দিনের এই স্মারকগুলো কি তবে কেবলই শোপিস? ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র পাল জানালেন, একদমই তা নয়। শৌখিন মানুষরা যেমন ঘরের কোণে এন্টিক পিস হিসেবে রাখার জন্য এগুলো সংগ্রহ করেন, তেমনি এখনো কিছু বিশেষ কাজে এর উপযোগিতা রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের পোল্ট্রি খামারে বিদ্যুৎ চলে গেলে ছোট বাচ্চা মুরগিকে প্রয়োজনীয় তাপ দেওয়ার জন্য এখনো হারিকেনের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া নবজাতক শিশুর জন্মের পর অনেক গ্রামীণ পরিবারে ঐতিহ্যগতভাবে গরম ছ্যাঁকা দেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করা হয়।
আর কে লাইট হাউস ঐহিত্যের আলোকযন্ত্র ধারণ করলেও তার ব্যবসায়িক আলো নিভু নিভু। তবুও পুরনো ব্যবসা ছাড়তে চাননা গোপাল চন্দ্র পাল। হারিকেন হ্যাজাকের পাশাপাশি তিনি ছোট ছোট হার্ডওয়ার যন্ত্রাংশ বিক্রি করছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় র চাবি। বাজারে চাবি ওয়ালারা যে ‘র চাবি দিয়ে চাবি বানান সেই চাবি পাওয়া যায় গোপাল চন্দ্র পালের দোকানে। এভাবে এটা সেটা করে কোন রকম নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন। গোপাল চন্দ্রের দুই ছেলের একজন স্কুল শিক্ষক, একজন এখনো ছাত্র। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন ছেলেরা এ দোকান আর রাখতে চাননা। কিন্তু গোপাল অলস বসে থাকার চেয়ে দোকানে বসাটা ভালো মনে করেন তাই টিকিয়ে রেখেছেনেঐতিহ্যের এ ব্যবসা।