শিউলী শারমিন
ছবি: সংগৃহীত
সবুজ পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা ভোরের প্রথম আলো যখন ডানায় মেখে কোনো পাখি উড়াল দেয় অসীম নীলিমায়, তখন মনে হয় নিসর্গের বুকে যেন এক টুকরো জীবন্ত স্বাধীনতা ভেসে বেড়াচ্ছে। গোধূলির ক্যানভাসে রঙের রেখা টেনে তাদের এই নীড়ে ফেরা কিংবা কুজন—প্রকৃতির এক আদিম ও মায়াবী সুরের জন্ম দেয়। তবে পাখির এই চিরন্তন সৌন্দর্যের সমান্তরালে, তারা তাদের ডানায় ভর করে সচল রাখছে দেশ ও বিশ্বের অর্থনীতির এক বিশাল চাকা, যা আমাদের চেনা হিসাবের খাতার বাইরেই রয়ে গেছে চিরকাল।
পাখির ওড়াউড়ি কেবল চোখের প্রশান্তি নয়, বিশ্বজুড়ে এটি এখন এক লাভজনক রূপকথা। ডানা মেলানো পাখিদের দেখার ব্যাকুলতা থেকে জন্ম নিয়েছে 'বার্ড-ওয়াচিং' বা পাখি পর্যটনের মতো এক বিশাল শিল্প। শুধু দূর দিগন্তে ডানা ঝাপটানো পাখি দেখার জন্য মানুষ দূরবিন হাতে ছোটোছুটি করছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই পাখিকেন্দ্রিক ভ্রমণ, ক্যামেরা-দূরবীন কেনা আর আবাসন মিলিয়ে বছরে ১০৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বাজারে ঘোরে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান জোগায় ১৪ লাখ মানুষের। এই সবুজ পর্যটন আজ বিশ্বের বহু দেশের স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক পরিবেশবান্ধব চাবিকাঠি।
কৃষিজমি আর বনাঞ্চলে পাখিরা এক-একজন দক্ষ ও নিবেদিত কর্মী, যারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দিনরাত খাটে। বিশ্বজুড়ে পাখিরা প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন টন फसलोंর শত্রু কীটপতঙ্গ সাবাড় করে। মাঠের গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে পাখির অবাধ বিচরণ থাকে, সেখানে প্রতি হেক্টরে কৃষকের ৭৫ থেকে ৩১০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত লাভ হয়; কারণ কৃত্রিম কীটনাশকের পেছনে তখন আর একটি টাকাও খরচ করতে হয় না। বনের বুকে পরাগায়ন ছড়ানো কিংবা অলক্ষ্যে দূর-দূরান্তে নতুন গাছের বীজ বুনে যাওয়ার যে কাজ পাখিরা করে চলে, মানুষের প্রযুক্তি দিয়ে তা করতে গেলে কোটি কোটি ডলারের তহবিলও কম পড়ত।
আমাদের বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭৩০ প্রজাতির পাখির আনাগোনা, যার মধ্যে ৩৫০টিরও বেশি পরিযায়ী। শীতের কুয়াশা ভেদ করে সাইবেরিয়া বা সুদূর ইউরোপ থেকে ডানা মেলে আসা এই অতিথি পাখিরা আমাদের হাওর, বিল আর চরাঞ্চলের জলজ বাস্তুতন্ত্রের প্রকৃত স্থপতি।
বক, পানকৌড়ি কিংবা চটপটে মাছরাঙারা জলাশয়ের শুধু অসুস্থ আর দুর্বল মাছগুলোকেই শিকার করে। প্রকৃতির এই সুনিপুণ নিয়মের ফলে সুস্থ মাছে রোগজীবাণুর সংক্রমণ ছড়াতে পারে না। মৎস্য চাষিরা মড়কের বড় লোকসান থেকে বেঁচে যান পাখির এই নীরব চিকিৎসায়।
প্রতিদিন হাজারো জলচর পাখির মলমূত্র থেকে এ দেশের জলাভূমিগুলোতে প্রায় এক টনেরও বেশি নাইট্রোজেন ও ফসফরাসসমৃদ্ধ জৈব উপাদান যুক্ত হয়। এই প্রাকৃতিক উপাদান পানির উর্বরা শক্তি ও মাছের প্রধান খাদ্য 'প্ল্যাঙ্কটন' বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে মাছের ফলন ও আশপাশের কৃষিজমির বুক ভরিয়ে দেয় সোনালী ফসলে।
মাঠের বুক জুড়ে ডানা মেলে পাখিরা প্রতিদিন পোকা আর ইঁদুর দমনে মায়াবী যুদ্ধ চালায়। রাতের আঁধারে ডানা মেলা একটি প্যাঁচা তার জীবনকালে ১০ থেকে ১২ হাজার ইঁদুর খেয়ে কৃষকের প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ফসল নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
শকুনের মতো মৃতভোজী পাখিরা লোকালয়ের মরা পশুপাখি নিমিষেই সাবাড় করে অ্যানথ্রাক্স বা জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক মহামারির বিষবাষ্প থেকে আমাদের রক্ষা করে। অন্যদিকে শীতের হাওরে যখন হাজারো পাখির মেলা বসে, তখন তাকে কেন্দ্র করে নৌকাভ্রমণ, গাইড সেবা আর গ্রামীণ জনপদে যে মৌসুমি অর্থনীতির ঢেউ ওঠে, তা প্রান্তিক মানুষের জীবনে নিয়ে আসে সচ্ছলতার আলো।
বিজ্ঞান বলে, পাখি হলো প্রকৃতির 'জৈব-সূচক' বা নীরব বিপৎসংকেত। কোনো জনপদ থেকে পাখির কলকাকলি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, সেখানকার জল-হাওয়া আর খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত হয়ে উঠছে। অথচ আজ আমাদের অতি-লোভ আর অসচেতনতায় বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে, নদী-নালা ভরাট হচ্ছে আর মাঠের বুকে পড়ছে বিষাক্ত কীটনাশক। ফলে সুর হারাচ্ছে বাংলার আকাশ।
পাখিদের বাঁচাতে কেবল ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইন কাগজে রাখলে চলবে না, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের গভীর ভালোবাসা ও সচেতনতা। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে আমাদের অন্তত ২০ শতাংশ প্রকৃতিকে পাখিদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সংরক্ষিত ঘোষণা করতে হবে। কারণ, পাখির ডানা যদি স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে প্রকৃতির সাথে সাথে থমকে যাবে মানুষের টিকে থাকার চাকাও।