Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

২০ হাজার গাছে আটকে ছিল ২১ মণ পেরেক

শেখ জালাল শেখ জালাল
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ জুন,২০২৬, ১২:৫৩ পিএম
২০ হাজার গাছে আটকে ছিল ২১ মণ পেরেক

বৃক্ষবন্ধু ওয়াহিদ সরদারের পেরেক তোলার কাজ চলছেই। ছবি: ধ্রুব নিউজ

২০ হাজার গাছের শরীরে আটকে ছিল ২১ মণ পেরেক। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ড, ব্যানার আর ফেস্টুন ঝোলানোর নামে মানুষ এই পেরেকগুলো ঠুকেছিল বোবা গাছগুলোর বুকে। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একাই লড়ছেন যশোর সদর উপজেলার সাড়াপোল গ্রামের আবদুল ওয়াহিদ সরদার, যিনি এলাকায় ‘বৃক্ষবন্ধু’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি শুধু ওই ২০ হাজার গাছের শরীর থেকেই পেরেকগুলো তুলে আনেননি, বরং সেই পেরেক বিক্রি করা টাকায় রাস্তায় রাস্তায় লাগিয়েছেন ৩০ হাজার নতুন গাছ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১। তবে বয়সের ভারে ক্লান্ত ওয়াহিদ সরদারের এই একলা লড়াই এখন এক চরম আক্ষেপের মুখোমুখি। এরচেয়েও প্রশ্ন—বোবা প্রকৃতির গায়ে নির্মমভাবে এত পেরেক প্রতিনিয়ত মারছে কারা?

সময়টা ২০১৮ সালের মে মাস। এক শনিবারের পড়ন্ত বিকেলে সাড়াপোল বাজারের আম গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঘষতেই এক তীব্র ক্ষত টের পেয়েছিলেন ওয়াহিদ সরদার। গাছে ঠুকে রাখা পেরেক বিঁধে গিয়েছিল তার পিঠে। নিজের শরীরের সেই তীব্র যন্ত্রণাই সেদিন আমূল বদলে দিয়েছিল এ মানুষটির জীবন দর্শন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ নিজের স্বার্থে প্রতিনিয়ত বোবা গাছগুলোর বুকে যে পেরেক ঠুকছে, তা কতটা অমানবিক। সেই থেকেই শুরু তার যুদ্ধ। বিগত আট বছরে সাতটি জেলা ঘুরে প্রায় ২১ মণ পেরেক তুলে আর সবুজে চারপাশ ভরিয়ে দিয়ে অনন্য হয়েছেন ওয়াহিদ সরদার।

নিজ উদ্যোগে ২০১৮ সালের ৪ জুলাই যখন তিনি প্রথম মাঠে নামেন, তখন যশোর টাউন হল ময়দানের মেহগনি গাছ থেকে শাবল দিয়ে ৬টি পেরেক তুলেছিলেন। ওই দিনই আরও কয়েকটা গাছ ঘুরে মোট ৫০টি পেরেক জমা হয়েছিল তাঁর ঝুলিতে। এরপর আর থামাথামি নেই। পেশায় রাজমিস্ত্রি এই মানুষটি দিন-রাত এক করে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন যশোর, নড়াইল, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা ও ঝিনাইদহসহ ৭টি জেলায়। যেখানেই গাছে পেরেক বিঁধতে দেখেছেন, পরম মমতায় শাবল দিয়ে তা উপড়ে নিয়েছেন। বিগত আট বছরে প্রায় ২০ হাজার গাছের শরীর থেকে তিনি মণে মণে পেরেক তুলেছেন।

এই লড়াইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও সুন্দর দিকটি হলো—গাছকে কষ্ট দেওয়া সেই লোহা দিয়েই আবার নতুন প্রাণের জন্ম দেওয়া! ২০২৩ সালের দিকে ওয়াহিদ সরদারের সংগ্রহে জমেছিল প্রায় ২১ মণ পেরেক। পরম মমতায় গাছ থেকে উদ্ধার করা এই পেরেকগুলো তিনি বাজারে গড়ে ২৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে দেন। আর সেই বিক্রির টাকা নিজের সংসারের পেছনে এক পয়সাও খরচ না করে, কিনে নেন নতুন চারাগাছ। গাছের বুক থেকে বের করা পেরেকের টাকায় সুতীঘাটা-মনিরামপুর সড়কে রোপণ করেন ৬০০টি ফলদ ও ওষুধি গাছ। এক গাছকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়ে, সেই টাকায় অন্য গাছের জন্ম দেওয়ার মত মহৎ কাজটি করে চলেছেন তিনি। শুধু গ্রাম কিংবা মফস্বল নয়, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঢাকার কাঁঠালতলা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকেও তিনি আরও কয়েক মণ পেরেক উদ্ধার করেছেন। ২০২৩ সালে যশোরের বন বিভাগের কর্মকর্তার কাছে নিজ দায়িত্বে জমা দিয়ে এসেছেন ৪০ কেজি লোহা।

আর্থিক অনটনের কারণে ওয়াহিদ সরদার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেননি। কিন্তু প্রকৃতিকে ভালোবাসার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পেরেকের কারণেই অনেক তাজা গাছ অকালে মরে শুকিয়ে যায়। আর তাই তো এক অদ্ভুত দাবি নিয়ে তিনি বলেন, ‘গাছের জীবন আছে, পেরেক ঠুকলে ওদেরও রক্তক্ষরণ হয়। পেরেকের আঘাতেই গাছগুলো মারা যাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আমি সরকারের কাছে মরা গাছের পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত দাবি করছি। যতদিন গাছে সাইনবোর্ড ঝোলানো বন্ধ না হবে, আমার এই লড়াই থামবে না।’

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই অনন্য অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১’ পেয়েছেন, এলাকায় ‘বৃক্ষ বন্ধু’ নামে সবাই তাকে একনামে চেনে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পথটি এখন আস্তে আস্তে ফুরিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ওয়াহিদ সরদারের পা ভেঙে যাওয়ার পর তার শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। ভাঙা পা আর বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো দূর-দূরান্তে সাইকেল চালিয়ে যেতে পারেন না তিনি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি কোনো তরুণ, কোনো স্বেচ্ছাসেবী দল তার হাত থেকে শাবলটি তুলে নিয়ে বলেনি—‘চাচা, এবার আপনি জিরিয়ে নিন, বাকি কাজটুকু আমরা করছি।’

ওয়াহিদ সরদারের সংসারে অভাব আছে। দুই ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার। স্ত্রী মুনজুরা বিবি জানান, দুর্ঘটনার পর শরীর ভেঙে পড়লেও ওয়াহিদ সরদারের মনটা পড়ে থাকে ওই গাছগুলোর কাছেই। পা একটু সইতেই আবার নতুন সাইকেল কিনে নেমে পড়েছেন চেনা রাস্তায়। তিনি ৩০ হাজার ফলদ ও ওষুধি গাছের চারা রোপণ করেছেন, যার মধ্যে ২৩ হাজার গাছ আজ মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে। রূপদিয়া-খড়িচাডাঙ্গা রোড, পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল মাঠ, হনিণা বিল সড়ক—সবখানেই জড়িয়ে আছে তার হাতের ছোঁয়া। শুধু গাছ নয়, একসময় ৮০টির মতো লাওয়ারিশ কুকুরকে আশ্রয় দিয়ে তার তৈরি করা খামার এলাকায় আলোড়ন তুলেছিল।

ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, ‘ওয়াহিদ সরদার পরিবেশের জন্য এক নিবেদিতপ্রাণ। আমি নিজে তার সাথে গিয়ে দুই হাজারের বেশি চারা লাগিয়েছি। তিনি আমাদের সমাজের বড় এক দৃষ্টান্ত।’

চাঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামীম রেজার মতে, ‘নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের ও প্রকৃতির জন্য এমন কাজ করা সত্যিই বিরল।’

প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই ভাঙা পা নিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেন এই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। পিঠে চটের বস্তা আর শাবলের খটখট শব্দে এক অদ্ভুত একাকীত্ব মিশে থাকে। মানুষ যদি গাছে পেরেক ঠোকা বন্ধ না করে, তবে ওয়াহিদ সরদারের পর এই বোবা প্রকৃতিকে ভালোবাসার আর কেউ কি অবশিষ্ট থাকবে না?

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)