রফিক মণ্ডল
মারিয়া তাবাসসুম তুলি ছবি: ধ্রুব নিউজ
কোভিড-১৯ মহামারির লকডাউনে দেশ যখন থমকে গিয়েছিল, তখন ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুরের একটি রান্নাঘর থেকে শুরু হয়েছিল এক নারীর নব উদ্যোম। মাত্র একটি ওভেন আর ফেসবুক পেজকে মূলধন করে মারিয়া তাবাসসুম তুলি গড়ে তোলেন ঘরোয়া কেক ব্যবসা যা বর্তমানে জেলার জনপ্রিয় ব্যান্ড 'TastyPastry'। এই বাস্তব উদাহরণটি দেখায় কীভাবে একজন সাধারণ মা ও স্কুল শিক্ষিকা তার শিক্ষাগত যোগ্যতাকে শুধু চাকুরির বাজারে আটকে না রেখে, ঘরে বসেই আরও ১৫ জন নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি টেকসই পথ দেখিয়েছেন।
মারিয়া তাবাসসুম তুলি ২০২৪ সালে ঝিনাইদহের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। দুই সন্তানের জননী তুলির বাবার বাড়ি ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুরে এবং শ্বশুরবাড়ি শহরের ব্যাপারীপাড়াতে। সংসার ও শিক্ষকতা পেশার প্রাত্যহিক দায়িত্ব সামলে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে তার এই অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
লকডাউনের অবরুদ্ধ সময়ে পড়াশোনা ও সংসারের চেনা ব্যস্ততার ছক ভেঙে অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের তৈরি কেক প্রদর্শন শুরু করেন তুলি। প্রথম দিকে একজন নারী হিসেবে কেক বানিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া এবং তা বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে নানা রকম প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। তবে এই কঠিন যাত্রায় বড় শক্তি হিসেবে পাশে দাঁড়ান তার স্বামী মো. মনিরুজ্জামান মাসুম। স্বামীর আকুণ্ঠ অনুপ্রেরণা ও সরাসরি সহযোগিতার পাশাপাশি তার বাবা, মা এবং ভাইও এই উদ্যোগের পরিধি বাড়াতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
স্বাদ এবং গুণগত মানের কারণে অল্প দিনেই ঝিনাইদহবাসীর গভীর আস্থা অর্জন করে 'TastyPastry'। বৈচিত্র্যের দিকে নজর দিয়ে তুলি তার তালিকায় যুক্ত করেন বিশেষ ঘরোয়া কেক, পেস্ট্রি, জার কেক, কাপ কেকসহ ভ্যানিলা, চকলেট, হোয়াইট ও ব্ল্যাক ফরেস্ট, লেমন, অরেঞ্জ, ম্যাঙ্গো এবং রেড ভেলভেটের মতো জনপ্রিয় সব আইটেম। সঠিক সময়ে ও রুচিশীল উপায়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কারণে খুব দ্রুতই জেলাজুড়ে তার কেকের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে।
নিজের এই উদ্যোগ নিয়ে মারিয়া তাবাসসুম তুলি বলেন, ঝিনাইদহে প্রথম ঘরোয়া কেক বাণিজ্যিকভাবে আমিই তৈরি করি। ঝিনাইদহবাসীকে ভালো মানের কেক খাওয়ানোই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি চাই যে সকল তরুণ-তরুণী বা শিক্ষিত বেকাররা শুধু চাকুরির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করছেন, তারা তা না করে ছোট পরিসরে হলেও নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করুক। অল্প কিছু আইটেম নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও দ্রুত স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।
তুলি শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হননি, বরং সমাজের বেকারত্ব দূরীকরণেও রাখছেন অনন্য অবদান। তিনি ইতিমধ্যে ঝিনাইদহ জেলার ১৫ জন নারীকে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগের মাধ্যমে ঘরোয়া কেক তৈরির ওপর পেশাদার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এই সফল নারী উদ্যোক্তা বলেন, পরবর্তীতে যদি সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা বা সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়া যায়, তবে আরও বড় পরিসরে ঝিনাইদহের বেকার যুবসমাজ ও নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন, যা জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।