রমজান আলী
কামারশালাগুলোতে বেড়েছে ব্যস্ততা ছবি: ধ্রুব নিউজ
কয়লার গনগনে আগুন। তাতে পুড়ে লাল টকটকে লোহা। বাঁ হাতের সাঁড়াশিতে সেই লোহা চেপে ধরে ডান হাতে ভারী হাতুড়ি দিয়ে চলছে একের পর এক আঘাত। ‘টুং-টাং, টুং-টাং’—লোহা পেটানোর এই চেনা শব্দই এখন শার্শার কামারপল্লীগুলোতে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে, এই শব্দের গতি আর ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। সকালের আলো ফোটার আগেই যে চুল্লিতে আগুন জ্বলছে, তা নিভছে গভীর রাতে।
কোরবানির পশু জবাই আর চামড়া ছাড়ানোর দা, বটি, ছুরি, চাপাতির চাহিদা এখন তুঙ্গে। ফলে কর্মকারদের এখন যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই।
গত কয়েক বছরে লোহা ও কয়লার দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। কাঁচামালের এই বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে কামারদের তৈরি নতুন সরঞ্জামের বাজারে। ফলে বাজারে নতুন জিনিসের চেয়ে পুরোনো সরঞ্জাম মেরামত আর শান দেওয়ার ভিড়ই বেশি।
দোকানিরা জানান, নতুন একটা ভালো মানের চাপাতি বা ছুরি কিনতে যে টাকা লাগছে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে পুরোনো দা-বটি ধার করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতারা তাই পুরোনো জিনিসপত্রেই ধার দিতে বেশি পছন্দ করছেন।
"আগে সব কাজ হাত চালায়ে করতে হতো, এখন কিছু কাজ মেশিনে করি। কষ্ট কমলেও বিদ্যুৎ বিল আর কয়লার দাম তো কমেনি! কাঁচামাল কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তাই নতুন মালের দাম একটু বেশি না ধরে উপায় নেই।" এভাবে কশ্টের কথা বলছিলেন বেনাপোলের একজন কামার।
সারা বছর কামারদের দিন কাটে লাঙলের ফলা, কোদাল বা কাস্তে বানিয়ে। সেই দিনগুলোতে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পুরো বছরের খরা কাটিয়ে একটু লাভের মুখ দেখতে তারা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন এই কোরবানির ঈদের দিকে। এই একটা মাসই তাদের রুটি-রুজির প্রধান চাকা।
আধুনিক যুগে প্লাস্টিক আর স্টিলের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী এই কামার শিল্প কিছুটা মলিন হলেও, কোরবানির ঈদে এদের বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। শত আর্থিক অনটন আর হাড়ভাঙা খাটুনির পরও বেনাপোলের অনেক কারিগর বংশপরম্পরায় টিকিয়ে রেখেছেন এই আদি শিল্পকে।