❒ গাছ লাগানোর মহোৎসবেও নেই বনের হিসাব
তহীদ মনি
ছবি: এ আই প্রণীত
গ্রীষ্মে রেকর্ড তাপমাত্রা, শীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, বর্ষায় কখনো অতিবৃষ্টি আবার বেশিরভাগ সময়ই অনাবৃষ্টি—প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণ এখন যশোরের চেনা ছবি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম অভিঘাত দেখে গবেষকেরা আশঙ্কা করছেন, যশোর অঞ্চলটি ধীরে ধীরে মরুময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বেশি বেশি গাছ লাগানো ও পানির উৎস বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ঠিক কত গাছ লাগাতে হবে, এ পর্যন্ত কত লাগানো হয়েছে আর কত বাকি—সবুজ যশোর গড়ার এই লড়াইয়ে আমাদের প্রকৃত অবস্থান আসলে কোথায়? প্রতি বছর ঘটা করে লাখ লাখ চারা রোপণ করা হলেও সেগুলো কতটুকু পরিপূর্ণতা পাচ্ছে, তার কি কোনো সঠিক হিসাব আছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গাছ লাগানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা কি আমাদের আছে, আর না থাকলে সেই গাছগুলো লাগানো হচ্ছে কোথায়? এতসব প্রশ্নের ভিড়ে উত্তর মিলছে না একটিরও।
সুন্দরবনের বুক চিরে জেগে ওঠা এই সুপ্রাচীন ও সবুজ জনপদ কালের বিবর্তনে, মানুষের বসতি স্থাপন এবং ক্রমাগত বন উজাড়ের কারণে আজ সম্পূর্ণ বনহীন হয়ে পড়েছে। যে মাটির নিচে এখনো সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অবশেষ রয়েছে, সেই যশোর আজ মরুময়তার আশঙ্কায় কাঁপছে। সুন্দরবনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আজ এ জেলায় কোনো প্রাকৃতিক বনভূমিই অবশিষ্ট নেই। সবুজ যশোর গড়ার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বনায়ন ও বনভূমির সঠিক তথ্যের এই অভাব। সরকার যখন দেশজুড়ে কোটি কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থা প্রতিদিন নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তখন যশোরে প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ কত, তা জানাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইতিহাস ও ভূ-তাত্ত্বিক গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজকের এই রুক্ষতার পেছনে রয়েছে এক সুপ্রাচীন সবুজ ও সমৃদ্ধ অতীত। বাংলাদেশর একটি প্রাচীন জনপদের নাম যশোর। ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার তার ‘অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাংলাদেশে যেসব এলাকায় সর্ব প্রথম লোক বসতি শুরু হয়েছিল যশোর তার মধ্যে অন্যতম। এই ভূখণ্ডটি গঠনের ইতিহাসও সুপ্রাচীন। গঙ্গার পলি দিয়ে এর সৃষ্টি। ভূত্ত্ববিদগণ অনুমান করেন এখন থেকে প্রায় ১০ লাখ বছর পূর্বে হিমালয়ের শেষ পর্যায়ের উত্থান হয়। তখন গঙ্গা নদী ভারত উপদ্বীপ ও মধ্যভারতের পার্বত্য এলাকার মধ্যবর্তী এক গভীর খাদের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো। এই নদী সে সময় সম্ভবত গোয়ালন্দের কাছে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিশতো। কালক্রমে গঙ্গা বাহিত পলি দিয়ে সাগরের বুকে দ্বীপ আকারে নতুন নতুন ভূ-ভাগ গঠিত হতে থাকে। আর সাগর সরে যেতে থাকে দক্ষিণে। গঙ্গার পলিতে সৃষ্ট ভূ-ভাগগুলো গাঙ্গেয় উপ-দ্বীপ বলে পরিচিতি লাভ করে। ২৫ হাজার বছর পূর্বে এই গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। যশোর ভূখণ্ডের যে সব দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছিল তা পরবর্তীকালে একক এক বিশাল ভূখণ্ডে রূপ নেয়। ভূ-খণ্ড সৃষ্টির সাথে সাথেই প্রাকৃতিকভাবেই সেগুলো বন-জঙ্গলে ভরে ওঠে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যে বিশাল সুন্দরবন তা একদিন আজকের যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সুন্দরবনের বুক চিরে জেগে ওঠা এই সুপ্রাচীন ও সবুজ জনপদ কালের বিবর্তনে, মানুষের বসতি স্থাপন এবং ক্রমাগত বন উজাড়ের কারণে আজ সম্পূর্ণ বনহীন হয়ে পড়েছে। যে মাটির নিচে এখনো সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অবশেষ রয়েছে, সেই যশোর আজ মরুময়তার আশঙ্কায় কাঁপছে। সুন্দরবনের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আজ এ জেলায় কোনো প্রাকৃতিক বনভূমিই অবশিষ্ট নেই। সবুজ যশোর গড়ার বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বনায়ন ও বনভূমির সঠিক তথ্যের এই অভাব। সরকার যখন দেশজুড়ে কোটি কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থা প্রতিদিন নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তখন যশোরে প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ কত, তা জানাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর সামাজিক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণের ফলে জেলার নতুন কতটুকু এলাকা বনাচ্ছাদিত হলো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা কতটা ভূমিকা রাখল, সেই হিসাব সাধারণ মানুষের অজানা। এমনকি খোদ জেলা পরিসংখ্যান অফিস, জেলা বন বিভাগ কিংবা জেলা প্রশাসনের তথ্য পোর্টালেও জেলাটির বনভূমির কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
যশোর জেলা প্রশাসনের তথ্য পোর্টাল অনুযায়ী, প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে যশোর বাংলাদেশের ১৩তম বৃহত্তম জেলা। খুলনা বিভাগের অধীন ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার মোট আয়তন ২ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৯৫ বর্গমাইল (প্রায় ৬ হাজার ৬৬৪ বর্গকিলোমিটার)। এর মধ্যে ৬০ বর্গমাইল নদী এলাকা। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী জেলার মোট জনসংখ্যা ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ১৪৪ জন এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১৮০ জন। এ জেলায় মোট ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমি রয়েছে এবং শিক্ষার হার ৭৭ দশমিক ০৭ শতাংশ। এই পোর্টালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি, মৎস্য, জনসংখ্যা ও কৃষকের সংখ্যাসহ অসংখ্য বিষয়ের নিখুঁত পরিসংখ্যান থাকলেও পুরো জেলায় বনভূমির পরিমাণ কতটুকু, তা কোথাও উল্লেখ নেই।
বন ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে ‘বনভূমি’ বলতে সাধারণত সরকারিভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে বোঝায়। সুন্দরবনের আদি অংশ হওয়া সত্ত্বেও রেকর্ডপত্র অনুযায়ী যশোর জেলায় এখন কোনো সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনভূমি নেই। আর এ কারণে এ জেলায় বনভূমির পরিমাণও হিসেব করতে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় না। তবে গুগল জানায় যশোর জেলায় নিজস্ব কোনো প্রাকৃতিক বা সংরক্ষিত বনভূমি নেই। তবে জেলাটিতে প্রায় ৩০০ হেক্টরের মতো সরকারি সামাজিক বনায়ন এবং রাস্তার দুই ধারের বনাঞ্চল বা গাছপালা রয়েছে। এছাড়া গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’-এর হিসাব মতে, প্রাকৃতিক বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৪ হেক্টর জমির মধ্যে স্থায়ী বনভূমি বা বনাঞ্চল রয়েছে মাত্র ৩০০ হেক্টর। মূলত বন অধিদপ্তরের আওতাধীন যশোর সামাজিক বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রধানত সড়ক ও মহাসড়কের পাশে সামাজিক বনায়ন বা স্ট্রিপ বাগান সৃজন করা হয়ে থাকে। সুন্দরবনের স্মৃতিবাহী ও প্রাচীন এই জেলাটি এখন প্রাকৃতিক রিজার্ভ ফরেস্টহীন এক রুক্ষ জনপদে পরিণত হয়েছে।
যশোরের একজন শিক্ষক আব্দুল মজিদ জানান, যখন যে সরকার আসে তখনই সে সরকার গাছ লাগানোর উপর জোর দেয়, এটা ভালো বিষয় তবে কতটা উন্নতি হচ্ছে এর কোনো হিসেব আমরা কখনো জানতে পারি না। বিএনপি সরকারের বিগত আমলে যশোরের প্রিয় নেতা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ছিলেন। সে সময় অনেক গাছ লাগানো হয়েছিল। এমনকি যশোরের ঐতিহ্য রক্ষায় খেজুর বাগান করা ও খেজুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অথচ যশোরে এখন খেজুরগুড়ের আকাল। গাছ পাওয়া যায় না। গাছিরা তাদের পেশা বদল করছে। দেীর্ঘদিন বিদেশে থেকে দেশে ফেরা রাজু আহম্মদও প্রায় একই কথা জানান।
অথচ আন্তর্জাতিক ও পরিবেশগত স্বীকৃত বিধান অনুযায়ী, একটি দেশের জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন । বাংলাদেশের সরকারি হিসেব অনুযায়ী, (বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে) দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ (২.৫৭ মিলিয়ন হেক্টর) এলাকায় বনভূমি রয়েছে। ১৭ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে তবে এর মধ্যে প্রকৃত বন আচ্ছাদন (ট্রি কভারেজ) প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ। এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতে, বাংলাদেশে প্রকৃত বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সরকার ২০২৬ সাল নাগাদ এই বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট আয়তনের ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান সরকার এটিকে আরও উন্নীত করতে চায়। দেশের মূল বনভূমির বাইরে সামাজিক বনায়ন ও গ্রামীণ গাছপালাসহ মোট বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ প্রায় ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
জাতীয় পর্যায়ের এই লক্ষ্যের সাথে সুন্দরবনের আদি অংশ যশোরের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। যশোরের একজন শিক্ষক আব্দুল মজিদ জানান, যখন যে সরকার আসে তখনই সে সরকার গাছ লাগানোর উপর জোর দেয়, এটা ভালো বিষয় তবে কতটা উন্নতি হচ্ছে এর কোনো হিসেব আমরা কখনো জানতে পারি না। বিএনপি সরকারের বিগত আমলে যশোরের প্রিয় নেতা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ছিলেন। সে সময় অনেক গাছ লাগানো হয়েছিল। এমনকি যশোরের ঐতিহ্য রক্ষায় খেজুর বাগান করা ও খেজুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অথচ যশোরে এখন খেজুরগুড়ের আকাল। গাছ পাওয়া যায় না। গাছিরা তাদের পেশা বদল করছে। দেীর্ঘদিন বিদেশে থেকে দেশে ফেরা রাজু আহম্মদও প্রায় একই কথা জানান।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত এই সংকটের বিষয়ে কথা বলেন শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। ভূগোল ও পরিবেশ বিদদের মতে, দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার বনভূমি না থাকলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ঝড়, বন্যা, দাবদাহ, তাপমাত্রা অতিরিক্ত ওঠা নামা অনাবৃষ্টি খরাসহ নানা প্রাকৃতিক প্রতিশোধের মুখে পড়ে। সেসব বিবেচনায় দেশের বনভূমির পরিসংখ্যান রাখার সাথে সাথে জেলার বনভূমির পরিসংখ্যানও সঠিকভাবে থাকা জরুরি বলে মনে করেন সরকারি এম এম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর মো. সোলজার রহমান এবং বর্তমান শিক্ষক প্রফেসর ড. কামরুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন সুধী।
তবে এই জরুরি তথ্যের উৎস কোথায়, তা নিয়ে খোদ সরকারি দপ্তরগুলোতেই রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা। জেলা পরিসংখ্যান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হোসেনের কাছে ২০০১ সালে যশোরে কতটুকু বনভূমি ছিল এবং ২০২৫ সাল নাগাদ তা সর্বশেষ কত শতাংশে পৌঁছেছে। এর উত্তরে তিনি জানান, এ জাতীয় পরিসংখ্যান তার বা তার বিভাগে নেই। এ জাতীয় কোনো পরিসংখ্যান তার অফিস কখনো করেনি।
যশোরের সামাজিক বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল জানান, যশোরের বনভূমি কতটুকু তা তিনি বা তার দপ্তর কেউ জানাতে পারবে না। এটা তার দপ্তরের কাজও না। তার দপ্তর সামাজিক বনভূমি বিস্তার, প্রতিবছর বৃক্ষ মেলার আযোজন, সরকারের গাছ লাগানো কর্মসূচির বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ ও নিজস্ব গাছ লাগানো, বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থাসহ অনেক কাজ করে থাকে।
এ প্রসঙ্গে তিনি জানান যশোরে ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল সামাজিক বনবিভাগের আওতায় রাস্তার পাশে পর্যন্ত মোট এ হাজার ১৮৬ কিলোমিটার বাগান তৈরি করা হয়েছে।২০০১ সালে ৮৪ কিলোমিটার বনায়ন হয় তবে সবচেয়ে বেশি হয় সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের সময়। সামাজিক বনায়ন হয় প্রায় ১১৩ কিলোমিটার রাস্তা এলাকায়। ২০২৪ সালে রাস্তার পাশে বনায়ন হয়েছিল মাত্র ১৫ কিলোমিটার।