Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

পাঠ্যবই প্রিন্টিং সিণ্ডিকেটের পকেটে ৬৫৯ কোটি

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ১৪ মার্চ,২০২৬, ০৬:৫৪ এ এম
পাঠ্যবই প্রিন্টিং সিণ্ডিকেটের পকেটে ৬৫৯ কোটি

সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে ছাপাকাজ বাগিয়ে নেওয়া, কাগজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বৃদ্ধি করা, আর্টকার্ড জালিয়াতি করে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ অনেক অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এ সিন্ডিকেট। চক্রটি শুধু টেন্ডার সিন্ডিকেটই করে না, কাগজের দাম হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণও করে। এমনকি কোন প্রেস কোন কোন কাজ পাবে, কাগজের কোন ব্যবসায়ী কী পরিমাণ কাগজ পাবেন এসবও তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই সিন্ডিকেট করে একটি চক্র প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। চক্রটি ২০২৫ সালে সিন্ডিকেট করে শুধু বই ছাপাকাজেই ৬৫৮ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৫ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কৌশলে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে ছাপাকাজ বাগিয়ে নেওয়া, কাগজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বৃদ্ধি করা, আর্টকার্ড জালিয়াতি করে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ অনেক অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এ সিন্ডিকেট। চক্রটি শুধু টেন্ডার সিন্ডিকেটই করে না, কাগজের দাম হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণও করে।

এমনকি কোন প্রেস কোন কোন কাজ পাবে, কাগজের কোন ব্যবসায়ী কী পরিমাণ কাগজ পাবেন এসবও তারা নিয়ন্ত্রণ করে। সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণ নিয়ে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত শিক্ষাবর্ষে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় পাঠ্যপুস্তক ছাপা নিয়ে সিন্ডিকেট শুরু করে দেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা পাঠ্যবই টেন্ডারের প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস করে নিজেদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের লট ভাগাভাগি করে নেয়। প্রিন্টিং প্রেসের মালিকরা অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হারে দরপত্র দাখিল করে সরকারের নির্ধারিত বাজেটের অতিরিক্ত ৬৫৮ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৫ টাকার বেশি লোপাট করেন।

আন্তর্জাতিক টেন্ডার বন্ধ হওয়ার সুযোগ কাজে লাগায় চক্রটি। অথচ জুলাই বিপ্লবের আগে প্রাথমিকের তিনটি শ্রেণির ৭০টি লটের দরপত্রে প্রাক্কলিত দরের থেকে গড়ে ১০ শতাংশ কমে দরপত্র দাখিল করেছিল মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। গত বছর প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি বই মুদ্রণ করে সরকার। এর জন্য ব্যয় হয় ২ হাজার ৭৬২ কোটি ৮ লাখ ৯১ হাজার ১৪৪ টাকা। বিশেষ এ প্রতিবেদনে বলা হয়, এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের দরপত্রে সিন্ডিকেট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী আর্ট প্রেস, লেটার এন কালার, এ্যাপেক্স প্রিন্টিং অ্যান্ড কালার, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, আনন্দ প্রিন্টার্স লিমিটেড, কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, সীমান্ত প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেয়। সূত্র বলছেন, এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রেস মালিকদের কাছে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এ দর ফাঁস করে দেন। পরে বড় বড় প্রেসের মালিকদের মধ্যে প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের মহসিন, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের দুলাল সরকার, আনন্দ প্রিন্টার্সের রাব্বানী জব্বার, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের রুবেল, কর্ণফুলী আর্ট প্রেসের রবিন ও কাজল গোপন বৈঠক করে পছন্দের লট ভাগাভাগি করে নেন।

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসাধু চক্র পছন্দের লট ভাগাভাগির পাশাপাশি অতিরিক্ত কার্যাদেশও হাতিয়ে নেয়। সমঝোতার মাধ্যমে তারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে দরপত্র দাখিল করে। সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের মালিক দুলাল সরকারের অফিসে এ দরপত্র সমঝোতা হয়। বই ছাপাকাজে সিন্ডিকেট রোধে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে টেন্ডারের প্রাক্কলিত দর ফাঁস রোধে এনসিটিবির সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া, আওয়ামী আমলের বিশেষ সুবিধাভোগী ও বর্তমানে বিএনপি মুখোশধারীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১১৯টি নিবন্ধিত পেপার মিল রয়েছে। এর মধ্যে এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরবরাহের সামর্থ্য রয়েছে বসুন্ধরা, মেঘনা, আম্বার সুপার, পারটেক্সসহ হাতেগোনা কয়েকটি মিলের। অন্য মিলগুলোর এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাগজ সরবরাহ করার মেশিনারি সাপোর্ট, ক্যাপাসিটি ও ফিন্যান্সিয়াল সাপোর্ট নেই। ফলে তারা স্পেসিফিকেশনের কম প্যারামিটারের কাগজ সরবরাহ করে। বই ছাপাকাজ পাওয়া কিছু প্রিন্টিং প্রেস বছরের শেষ দিকে এসে নোট ও গাইড বই ছাড়াও বিভিন্ন ছাপাকাজ করে থাকে। এতে সংকট দেখা দেয় কাগজের।

একই সঙ্গে বই ছাপাকাজও পিছিয়ে যায়। কিছু ছাপাখানা পুস্তক প্রকাশনীর পাশাপাশি পেপার ট্রেডিংয়ের সঙ্গেও জড়িত থাকে। বিভিন্ন পেপার মিলের সঙ্গে তারা অগ্রিম চুক্তি করে অধিকাংশ কাগজ কিনে ওয়্যারহাউসসহ বিভিন্ন গুদামে রেখে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। পরে ছোট ছোট ছাপাখানাকে এসব কাগজ কিনতে বাধ্য করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাগজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মিন্টু মোল্লা, শেখ সিরাজ, দুলাল সরকার, ওমর ফারুক, মহসিন, রুবেল-রবিন, রাব্বানী জব্বার, দেওয়ান কবির প্রমুখ।

তথ্য বলছে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্ষেত্রে দেশের ছোটবড় প্রায় ২৩ কাগজের মিল সরাসরি ও তাদের ডিলারদের মাধ্যমে প্রেসগুলোতে কাগজ সরবরাহ করেছে। মিলগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার টন। কিন্তু প্রতি বছর কাগজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিল মালিকরা কাগজের মূল্য বৃদ্ধি করে দেন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট মানের কাগজের মূল্য নিয়ে নিম্নমানের কাগজ উৎপাদন ও সরবরাহ করেন। কিছু কিছু অসাধু প্রিন্টিং প্রেস মালিক একাকী বা দলবদ্ধ হয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কাগজের মূল্য বৃদ্ধি করে থাকেন। মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবেদন বলছে, মল্লিক পেপার মিল, ক্যাপিটাল পেপার মিল ও আজাদ পেপার মিল পরিচালনা করে থাকেন সরকার প্রেসের মালিক ওমর ফারুক। রশিদ পেপার মিল পরিচালনা করেন অটো প্রিন্টিং প্রেস ও মোল্লা প্রিন্টিং প্রেসের মালিক মিন্টু মোল্লা।

তথ্যমতে পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ২৩০ জিএসএম আর্টকার্ড সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। নিয়ম মেনে আর্টকার্ড আমদানি করলে ভ্যাট ও ট্যাক্সের কারণে দাম বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু সিন্ডিকেট অসদুপায় অবলম্বন করে এ আর্টকার্ড আমদানি করে গোপনে সংরক্ষণ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে পাঁচ-ছয় ব্যক্তি ও তিন-চারটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি জড়িত। প্রতিবেদন বলছে, মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের দেওয়ান কবির, ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েট, রহমত এন্টারপ্রাইজ, নয়াবাজারের ইউসুফ এন্টারপ্রাইজ, সরকার প্রেসের ওমর ফারুক, প্রেস মালিক তোফায়েল, দশ দিশা প্রিন্টার্সের আমিন হিলালী, রাফিন এন্টারপ্রাইজসহ অন্যরা এতে জড়িত। সিন্ডিকেট করে দর বাড়িয়ে অর্থ লোপাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে লেটার এন কালার লিমিটেডের নির্বাহী রাশেদ হোসাইন প্রতিবেদককে বলেন, ‘পাঠ্যবই ছাপাকাজের টেন্ডার কার্যক্রম আমি নিজেই সম্পন্ন করে থাকি। এ ক্ষেত্রে কোনো সিন্ডিকেট করা হয় না। কোনো নেগোসিয়েশনও করা হয় না।’ নিয়ম মেনে সব কাজ করেন বলে জানান তিনি। পাঠ্যবই ছাপাকাজের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে দর বাড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী মামুন হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ধ্রুব/এস.আই

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)