রফিক মন্ডল
সাংবাদিকতার মূল নির্যাস লুকিয়ে থাকে মানুষের কথা বলা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং সমাজের অনিয়ম-অসংগতি সাহসের সঙ্গে তুলে ধরার মধ্যে। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে, বিশেষ করে মফস্বলে এই মহতী পেশার রূপটি এখন ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার সাম্প্রতিক কিছু চিত্র এই প্রশ্নটিকেই নতুন করে জনসমক্ষে এনে দিয়েছে—গ্রামীণ সাংবাদিকতা কি আদৌ নীতি-নৈতিকতাভিত্তিক কোনো পেশা, নাকি তা স্রেফ প্রভাব খাটানো ও ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের একটি সহজ ‘পরিচয়’?
কোটচাঁদপুর ছোট একটি উপজেলা। অথচ এখানে সাংবাদিক সংগঠন ও পরিচয়ধারী সংবাদকর্মীর অভাব নেই। সংবাদের সংখ্যার চেয়ে সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার এই প্রবণতা কেবল কোটচাঁদপুরেই নয়, দেশের প্রায় প্রতিটি মফস্বল শহরেরই সাধারণ চিত্র। কিছুদিন আগে কোটচাঁদপুরের দুই প্রবীণ ও প্রয়াত সাংবাদিক শেখ নজরুল ইসলাম ও খন্দকার শামসুজ্জামানের স্মরণসভায় তাঁদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সততার যে স্মৃতিচারণ করা হলো, তার সঙ্গে বর্তমানের বাস্তবতার ফারাকটা সত্যি আকাশ-পাতাল।
মফস্বলে এখন ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের ব্যবহার বেড়েছে জ্যামিতিক হারে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি পেশাদারিত্ব বা নৈতিকতা। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মিত বা ভুয়া পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে অনেকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, সুবিধা আদায় কিংবা নানা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। এর নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হচ্ছে সত্যনিষ্ঠ পেশাদার সাংবাদিকদের, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
সম্প্রতি কোটচাঁদপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সাংবাদিকদের দূরত্বের খবর কিংবা একজন প্রেসক্লাব সভাপতির মাদকসহ গ্রেপ্তারের মতো ঘটনার পর সামাজিক ও সামাজিকভাবে যে নেতিবাচক বার্তা গেছে, তা পুরো পেশাটির জন্যই বিব্রতকর। আইনগত প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকেই চূড়ান্ত অপরাধী বলা যায় না, তবে এ জাতীয় ঘটনা সমাজে সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ধসিয়ে দেয়—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
সমস্যাটা একাধিক সংগঠন থাকা বা না থাকার মধ্যে নয়; সমস্যাটা সাংবাদিকতার মান ও উদ্দেশ্যে। যখন কোনো পেশার কার্ড বা পদ সামাজিক ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। পেশাদার সাংবাদিকদের এখন ভাবার সময় এসেছে—কারা সাংবাদিকতা করছেন আর কারা কেবল পরিচয়পত্রটি বিক্রি করে বা ঝুলিয়ে সামাজিক মর্যাদা হাসিল করছেন?
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দুটি: প্রথমত, সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব স্বচ্ছতা ও আত্মশুদ্ধি। কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার আগে বা কোনো সংগঠনে সদস্যপদ দেওয়ার আগে ব্যক্তির পেশাগত যোগ্যতা, নিয়মিত সংবাদ প্রকাশের সত্যতা ও নৈতিক অবস্থান কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ অন্যায় বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে তাকে সাধারণ অপরাধীর মতোই বিচার করতে হবে, এখানে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়কে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে, কোনো প্রকৃত সাংবাদিক যেন স্বাধীন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রশাসনিক হয়রানি বা প্রতিহিংসার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।
মফস্বল সাংবাদিকতার ঐতিহ্য কোনো কার্যালয়ের ঝুলানো সাইনবোর্ড কিংবা ভিজিটিং কার্ডের চাকচিক্যে টিকে থাকে না। প্রবীণ সাংবাদিকদের দেখিয়ে যাওয়া পথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকের আসল পরিচয় তার পরিচয়পত্র বা পদবি নয়, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ সংবাদ। কোটচাঁদপুরসহ সারা দেশের গ্রামীণ সাংবাদিকতায় এখন যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে অবিলম্বে একটি তথ্যভিত্তিক ও নীতিগত আত্মশুদ্ধির অভিযান জরুরি। নতুবা ‘সাংবাদিক’ শব্দটি সম্মানের প্রতীক না হয়ে কেবলই এক বিতর্কিত পরিচয়ে পরিণত হবে।