রফিক মণ্ডল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ বিস্তারের যুগে সংবাদ পরিবেশনার সহজলভ্যতা যেমন বেড়েছে, তেমনি একটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে ফেসবুক পেজ কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজেদের ‘সাংবাদিক’ দাবি করার মহোৎসব। সম্প্রতি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই অপেশাদার অনলাইন সংবাদকর্মীদের দাপট, ভুঁইফোঁড় পোর্টালের উৎপাত এবং সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের চিরন্তন ভাবমূর্তি পড়ছে চরম প্রশ্নের মুখে।
সাংবাদিকতা কেবল একটি স্মার্টফোন, একটি বুম বা আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো কোনো পেশা নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার জায়গা। অথচ তথাকথিত এসব ভুঁইফোঁড় ‘সাংবাদিকদের’ সিংহভাগেরই নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা সাংবাদিকতার ন্যূনতম এথিক্স বা নীতিমালার জ্ঞান। তথ্য যাচাই না করে কেবল ভিউ আর লাইকের আশায় মুখরোচক সংবাদ প্রচার, একতরফা তথ্য দিয়ে ব্যক্তির চরিত্রহনন এবং পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নামে অর্থ দাবি—এসবই এখন তাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ক্রমবর্ধমান অপসাংবাদিকতা রোধে এখন আর চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। প্রথমত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভুয়া সাংবাদিকদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যারা ভয়ভীতি প্রদর্শন বা চাঁদাবাজি করছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে হবে, যাতে যেকোনো নামসর্বস্ব পেজ বা চ্যানেল সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা দাবি করতে না পারে।
একই সাথে স্থানীয় প্রেসক্লাব ও মূলধারার সংবাদকর্মীদেরও এই ভুঁইফোঁড় চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রকৃত ও ভুয়া সাংবাদিকদের পার্থক্য যেন সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাঠক ও সাধারণ সমাজকেও সচেতন হতে হবে—একটি ফেসবুক পেজ বা চ্যানেল খুললেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না; সাংবাদিকতা প্রমাণ করতে হয় বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা ও পেশাদারিত্বের নিরিখে। তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, একে কোনো অপশক্তির হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।