ধ্রুব ডেস্ক
নিহত ফিরোজা বেগম ও তার মেয়ে ফারজানা আকতার রাত্রি। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার কলাবাগানে স্ত্রী ও শাশুড়িকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর পিকআপ চালক হৃদয় শিপন তার শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে নিজেই থানায় গিয়ে ধরা দেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলছেন, স্ত্রী ফারজানা আকতার রাত্রির (২০) সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হত শিপনের (৩০)। ‘মাতাল’ অবস্থায় তিনি স্ত্রীকে ‘মারধরও’ করতেন।
দুদিন আগে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শিপনের কথা কাটাকাটি হয়। স্ত্রী ঢাকার কলাবাগানে বাবার বাসায় ফেরার পর রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেখানে হাজির হন শিপন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আগের বিষয় নিয়ে ফের বাগবিতণ্ডার মধ্যে স্ত্রীকে তিনি ছুরিকাঘাত করেন। রান্নাঘর থেকে শাশুড়ি ফিরোজা বেগম (৩৮) এগিয়ে এলে তার গলাতেও ছুরি চালিয়ে দেন।
এরপর নিজের ১৪ মাস বয়সী শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কলাবাগান থানায় হাজির হয়ে শিপন খুনের কথা পুলিশকে জানান।
কলাবাগান থানার ওসি ফজলে আশিক বলেন, “সে এসে বলে ‘আমি মার্ডার করছি’। সাথে সাথে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে তাকে হেফাজতে নিই। তার দেওয়া ঠিকানায় ফোর্স পাঠাই।
“পরে ওই বাসা থেকে শিপনের স্ত্রী রাত্রির লাশ উদ্ধার করা হয়। তার আগেই রাত্রির মা ফিরোজাকে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে তিনিও মারা যান।”
কেন এই হত্যাকাণ্ড
কাঁঠালবাগানের আলামিন সড়কে ‘শীতল নিবাস’ নামে পাঁচতলা একটি বাড়ির পঞ্চম তলায় রাত্রিদের বাসা। তার বাবা ফারুক হোসেন একজন ফল ব্যবসায়ী। রাত্রির দুই ভাইয়ের মধ্যে আল আমিনের বয়স ১৮ বছর; আর ইয়ামিনের বয়স ৮ বছর।
রোববার সকালে ঘটনার সময় ফারুক ছিলেন তার ফলের দোকানে। তার বড় ছেলে আল আমিন রয়েছেন শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে। ওই সময় বাসায় ছিলেন রাত্রি, তার মা ফিরোজা বেগম আর ছোট ভাই ইয়ামিন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পেশায় পিকআপ চালক শিপনের সঙ্গে বছর পাঁচেক আগে রাত্রির বিয়ে হয়। শিপনের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর এলাকায়। বিয়ের আগে শিপন পান্থপথ এলাকায় থাকতেন।
বিয়ের পর রাত্রিকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন শিপন। কিন্তু সেখানে নানা বিষয় নিয়ে তাদের ঝগড়ার জেরে রাত্রি ঢাকায় বাবার বাসায় ফিরে আসেন।
রাত্রির মামাতো ভাই রুবেল বলেন, “বিয়ের পর প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগে থাকত, রাত্রিকে মারধর করত শিপন। পরে মামা রাত্রিকে ঢাকায় নিয়া আসে, বলে যে তার মেয়েরে আর জামাইয়ের বাড়ি পাঠাবে না।”
সে সময় তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। কিন্তু রাত্রি ও শিপনের ইচ্ছায় বছর দুয়েক আগে তাদের আবার বিয়ে হয়।
এরপর শিপন ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাসা নেন, স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায়নি।
রুবেল জানান, প্রায়ই রাত্রিকে মারধর করতেন শিপন। সে কারণে রাত্রি বেশিরভাগ সময় বাবার বাসাতেই থাকতেন। মাঝেমধ্যে শিপনও শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকতেন।
রাত্রির বাবা ফারুক বলেন, তার ভাতিজার বিয়ে উপলক্ষে দিন দশেক আগে তার স্ত্রী-সন্তানরা গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। আর গত শুক্রবার বিয়ের আগেরদিন তিনি নিজে এবং শিপন গোসাইরহাটে যান।
বিয়ের দিন সকালেও রাত্রি ও তার স্বামীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি হয়। সে কারণে শিপন বিয়ের আগেই ঢাকায় ফিরে আসেন। স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে নিয়ে ফারুক ঢাকার ফেরেন শনিবার রাতে। তার বড় ছেলে আরো কিছুদিন থাকবে বলে বাড়িতেই রয়ে যান।
ফারুক বলেন, “সকাল ৭ টার দিকে আমি দোকানে চলে যাই। এরপর মেয়ের জামাই বাসায় আসছে। আমি বাসায় আছিলাম না, ও যে আসছে আমি জানতামও না। এরমধ্যে এই ঘটনা ঘইটা গেল।”
রাত্রির মামাতো ভাই রুবেল বলেন, “শিপন বিয়া খাইতে গেছিল যেদিন, হের লগে তার দুটা বন্ধু আছিল। তারা নাকি নেশাপানি করে। এই নিয়া রাত্রি তার জামাইর লগে রাগারাগি করছে, তাগোরে ক্যান নিয়া গেছে। ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে বিয়া না খাইয়াই শিপন ঢাকায় চইলা আসে।
“আজকে সকালে শিপন বাসায় আইলে আবার ওই বিষয় নিয়া রাগারাগি হয়। এর মধ্যে রাত্রিরে ছুরি মারলে তার মা রান্নাঘর থেইকা রুমে গেলে হেরেও ছুরি মারে।”
রুবেল বলেন, “তখন রাত্রির ছোটভাই ইয়ামিন দৌড়াইয়া বাইরের ছাদে চইলা যায়। হেয় থাকলে হেরেও মাইরা ফেলত। পরে সে নিচে গিয়া লোকজনরে বলছে, দৌড়াইয়া তার বাবার দোকানে গিয়া খবর দিছে।”
খবর পেয়ে ফারুক বাসায় আসার আগেই শিপন তাদের শিশু সন্তান রায়হানকে নিয়ে থানায় চলে যান। ফারুক এসে দেখেন মেয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে, আর স্ত্রী কাতরাচ্ছেন।
পরে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে ছোটেন ফারুক। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, ফিরোজাও মারা গেছেন।
শিপন মাদকাসক্ত ছিলেন কি-না জানতে চাইলে রুবেল বলেন, “পিকআপ চালাইতো, বুঝেনইতো। নেশাপানি করত, আর প্রায়ই রাত্রিরে মারধর করত।”
আর শিপনের চাচাতো ভাই সোহান ইসলাম বলেন, “পিকআপ ড্রাইভারতো, ওইটা হইতেই পারে।”
ভয়ে কাঁদছে শিশু ইয়ামিন, হতবিহ্বল ফারুক
আট বছর বয়সী ইয়ামিনের সামনেই তার বড়বোন ও মাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। দেখতে পেয়ে সে দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে ছাদে আশ্রয় নেয়। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চিৎকার করে সবাইকে বলে, বাবাকে খবর দেয়।
রোববার দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সামনে প্রতিবেশী ও উৎসুক জনতার ভিড়। ভেতরে স্বজন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বাদে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না।
এর মধ্যে পঞ্চমতলায় গিয়ে দেখা যায়, একপাশে দুই কক্ষের ফ্ল্যাট, আরেকপাশে একটি এক কক্ষের ফ্ল্যাট। আর বাকি অংশে ছাদ। সেখানে ইয়ামিন অনবরত কেঁদে চলছে আর স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তাকে যাই জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, সে শুধু বলতে পারছে, “আমি ছাদে গিয়া পলাইছি, আর কিছু জানি না।”
রাত্রির লাশ নেওয়ার পর তাকে নিয়ে বাসার ভেতরে যেতে চাইলেই চিৎকার করে বলছে, “আমি বাসায় যামু না, আমারে বাইরে নিয়া যাও।”
আরেক স্বজনের কোলে রাত্রি ও শিপনের শিশু সন্তান রায়হান। অবুঝ শিশুটিও মানুষের ভিড় দেখে ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছিল।
ফারুকের বন্ধু স্থানীয় দর্জির দোকানী মোখলেসুর রহমান বলেন, “ফারুকের লগে আমার দীর্ঘ দিনের চলাফেরা। খবর পাইয়া যখন আসছি, তখন পুলিশের এক স্যার আইসা বলতেছে, আপনি থানায় গিয়া বাচ্চাটা নিয়া আসেন। পরে আমি গিয়া বাচ্চাটা নিয়া আসছি। ওই অমানুষটা বাচ্চাটারে যে মাইরা ফেলে নাই, এই অনেক।”
রাত্রীর বান্ধবী ময়না বলেন, “তাগো ছাড়াছাড়ি হইয়া গেছিল। এরপর শিপন তার শাশুড়িকে ফোন দিয়া নানানভাবে বুঝাইতো। তাগো নিজেগো পছন্দের বিয়া আছিল। রাত্রিও চাইছিল, এইজন্য পরে আবার বিয়া হইছিল। এরপরেই একটা বাচ্চা হইছে। যদি পরে আবার ওই পোলার কাছে না যাইত, তাইলে এই দিন দেখতে হইত না।”
ঘটনার পর বাসায় যায় পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। বিভিন্ন আলামত ও লাশ উদ্ধারের পর বাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষের বিছানা ও কাপড়চোপড় এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে, মেঝে রক্তাক্ত। যেখানে প্রথমে রাত্রিকে ছুরি মারা হয়, পরে সেখানে রাত্রির মা দৌড়ে গেলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায়, একটি রুটি বানানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মেয়ে আর জামাতার ঝগড়া শুনে রুটি বানানো ফেলেই এগিয়ে গিয়েছিলেন ফিরোজা।
ফারুক বলেন, “বিয়া খাইতে বাড়ি গেছিলাম আমরা, বাড়িতে একটু দ্বন্দ হইছে পরে জামাই বিয়া না খাইয়া চইলা আইছে। আজকেতো আমার ফ্যামিলি শেষ কইরা দিল। আমার একটা নাতি, একটা ছেলে ছোট। আমার সব শেষ কইরা দিল।”
কলাবাগান থানার ওসি ফজলে আশিক সন্ধ্যায় বলেন, “দুজনকেই গলাসহ শরীরের বিভিন্নস্থানে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। লাশ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেলে রয়েছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। মামলার পরে শিপনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার আদালতে পাঠানো হবে।”
সূত্র : বিডি নিউজ