Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

পাহাড়, নদী আর অবারিত সবুজের মিলনমেলায়

আব্দুর রহমান আব্দুর রহমান
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল,২০২৬, ১১:২৯ পিএম
পাহাড়, নদী আর অবারিত সবুজের মিলনমেলায়

সবুজ নদী পাহাড়ের মাঝে লেখক ছবি: লেখক

৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেট। বারবার যেতে মন চায়। পাহাড়, নদী আর অবারিত সবুজের মিলনমেলা বারবার টেনে আনে।

ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অফ মুসলিম ইয়ুথ (WAMY) এর আমন্ত্রণে ২০০১ সালে প্রথমবার সিলেট যাই। ৬৪ জেলা থেকে বাছাই করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়। সাত দিনে বিভিন্ন আয়োজন ছিল। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, এমসি কলেজ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সেশন এবং পর্যটন এলাকায় পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। দেশি-বিদেশি অতিথিদের সাথে চলাফেরা, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বগুণ তৈরি হয়। সেখান থেকে একসাথে মিলেমিশে থাকা, শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতির শিক্ষা গ্রহণ করেছি। তখন থেকেই আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিপক্ক হয়।

৫ বছর পর ২০০৬ সালে দ্বিতীয়বার সিলেট যাই জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ‘কিশোর কণ্ঠ’ পরিবারের তারুণ্যের ভ্রমণে। অজানাকে জানা, মূল্যবোধের চর্চা ও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন আর রোমাঞ্চকর অনুভূতির জন্ম দেয়। যতদূর মনে পড়ে, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, ইতিহাস এবং জীববৈচিত্র্য জানার এক দারুণ সুযোগ পাই।

তৃতীয়বার গিয়েছিলাম ২০০৮ সালে আইসিএস কেন্দ্রীয় সদস্যদের ভ্রমণে। তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক, বর্তমান সংসদ সদস্য সালেহী ভাইয়ের নেতৃত্বে চা গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করা হয়। চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ, চা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উন্নত জাতের চা উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা সম্পর্কে জানতে পারি।

চতুর্থবার গেলাম ২০১৮ সালে সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক ভ্রমণে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নাগরীলিপি সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।

পঞ্চমবারের মতো এবারের সিলেট ভ্রমণ ছিল দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশন লি. এর ডিপিপি ইউনিটের আয়োজন।

১১ এপ্রিল শনিবার অফিসের কর্মব্যস্ততা শেষে দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদের বাংলা বর্ষবরণ ১৪৩৩ উৎসব বাস্তবায়ন প্রস্তুতি সভায় অংশগ্রহণ করি। এরপর সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের বোর্ড মিটিংয়ে কিছু সময় উপস্থিত থেকে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যায়। তড়িঘড়ি করে সপরিবারে কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছালাম নির্ধারিত সময়ের আগেই। রাত ১০টার কিছু পরেই সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল উপবন এক্সপ্রেস।

ভোরে পৌঁছালাম সিলেট। উঠলাম চার তারকা হোটেল নূরজাহান গ্র্যান্ডে। সেখানে দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশন লি. চেয়ারম্যান পরম শ্রদ্ধেয় শিব্বির মাহমুদ স্যার, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান খন্দকার এনায়েত হোসেন স্যার ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার জাকির হোসেন স্যারসহ সকলকে অভ্যর্থনা ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানান দৈনিক নয়া দিগন্ত সিলেট ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার, ব্যুরো রিপোর্টার এম জে এইচ জামিল, গোয়াইনঘাট-জাফলং প্রতিনিধি মুহাম্মদ আমির উদ্দিন, জকিগঞ্জ প্রতিনিধি রহমত আলী হেলালি ও ব্যুরো ফটোগ্রাফার জয়নাল আবেদীন।

এবারের সিলেট ভ্রমণের প্রথম দিন ১২ এপ্রিল রোববার সকালে নূরজাহান গ্র্যান্ডে বুফে ব্রেকফাস্ট শেষে নিচে নামলাম। রাস্তার অপজিটে চোখে পড়লো ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, যা এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সাহিত্য সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এটা বই, ম্যাগাজিন, শিলালিপি ইত্যাদির সব থেকে বড় বেসরকারি সংগ্রহশালা, যার অনেক কিছুই ১৩শ শতাব্দীর। ১৯৩৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রখ্যাত সাহিত্য গবেষক মুহাম্মদ নুরুল হক "কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ" প্রতিষ্ঠা করেন।

বুফে ব্রেকফাস্ট ব্যবস্থা করার জন্য মাননীয় চেয়ারম্যান ও এমডি মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। রাতে ট্রেন জার্নির পর সকালে শরীরের শক্তি বৃদ্ধির জন্য একটি পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নানান ধরনের খাবার শরীরকে সক্রিয় করে এবং শক্তি জোগায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্ট শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে মনোযোগ বাড়ায় এবং দিনভর কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নানান ধরনের মেন্যু আর অসাধারণ টেস্ট। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের বৈচিত্র্য, উপাদানের মান এবং সাজসজ্জা সবই অত্যন্ত চমৎকার।

সিলেট শহর থেকে আমরা যাই দেশের সবচেয়ে বড় সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল, যা বাংলাদেশের একমাত্র ও বিশ্বের অন্যতম মিঠাপানির জলাবন। রাতারগুল "সিলেটের আমাজন" নামে পরিচিত। এটি পুরোপুরি একটি পানিবেষ্টিত বন। ডিঙি নৌকায় পানির ওপর ভাসমান বনের সৌন্দর্য, হিজল-করচ গাছ এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির প্রকৃতির এক অনন্য মুগ্ধতা তৈরি করে। নৌকা থেকে পানিতে পা নামাতেই পুরো শরীর শীতল হয়ে গেল। রাতে ট্রেন জার্নির ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়। অরণ্যের শান্ত পরিবেশ, নিঝুম পানির ভেতর দিয়ে প্রকৃতির আরো নিকটে চলে যাই। নৌকা নিয়ে বনের ভেতর দিয়ে চলা এক রহস্যময় অ্যাডভেঞ্চার।

পুরো বন যেন ঘন সবুজের চাদরে ঢাকা। প্রাণিবৈচিত্র্যে ভরপুর এই বনে রয়েছে নানান প্রজাতির পাখি। এর মধ্যে মাছরাঙা, বিভিন্ন প্রজাতির বক, ঘুঘু, ফিঙে, বালিহাঁস ও পানকৌড়ি। বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে বানর, বনবিড়াল, কাঠবেড়ালি ও মেছোবাঘ। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও গুঁইসাপের অভয়ারণ্য এই বন। প্রকৃতির এক নিঃশব্দ বিস্ময়। জলজ জঙ্গলের নীরবতা থেকে বাতাসে ভেসে আসে জীবন আর শান্তির চূড়ান্ত মিলন।

রাতারগুল শুধু প্রকৃতি দর্শনের জায়গা নয়, এক আত্মিক শুদ্ধতার স্থান। এখানে ঘুরে বুঝতে পারলাম প্রকৃতি এতটা নীরব হয়েও এত কথা বলতে পারে। এই বন যেন নিজেই এক জীবন্ত উপন্যাস, যার প্রতিটি পাতায় লেখা আছে পানি, পাতা ও পাখির গল্প।

রাতারগুল থেকে আমরা চলে যাই ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন এলাকায়। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত মনোমুগ্ধকর স্থান। ঝরনার স্বচ্ছ নীল পানি, ছোট-বড় সাদা পাথর এবং পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করলাম।

ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টে পৌঁছালে স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। দুপুরের খাবারের পর পর্যটন ঘাট থেকে ট্রলারে করে সাদা পাথর ঘাটে গিয়ে নামলাম। ঘাট থেকে সাদা পাথর এলাকায় পায়ে হেঁটে যেতে ১০ মিনিট সময় লাগে। আয়মান বলল ঘোড়ায় চড়ব। আমি আর আয়মান ঘোড়ায় চড়ে সাদা পাথরের বিছানায় পৌঁছালাম। প্রথমদিকে ভীতি কাজ করলেও, অশ্বের ছন্দময় গতির সাথে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। শান্তভাবেই চলেছে ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে বসে প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব ভালোভাবে উপভোগ করলাম। যতদূর চোখ যায় কেবল সাদা সাদা পাথর, মাঝখানে স্বচ্ছ নীল পানি, উপরে নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন যেন প্রকৃতির এক অপরূপ স্বর্গরাজ্য। মনে হয় যেন প্রকৃতি শুভ্র বিছানা বিছিয়ে রেখেছে। মনোলোভা ধলাই নদীর রূপ, সবুজ পাহাড়, সারা এলাকা জুড়ে অজস্র সাদা পাথর, আকাশের নীল মায়া রেখে যায় পাথরে জমে থাকা স্ফটিক পানিতে। দূরের পাহাড়গুলোর উপর মেঘের ছড়াছড়ি, সাথে গড়িয়ে পড়া ঝরনার পানি, চিক চিক করা রুপালি বালু আর ছোট-বড় সাদা অসংখ্য পাথর মিলে এ যেন এক পাথরের রাজ্য। ঝরনার স্বচ্ছ শীতল পানি ও রাশি রাশি সাদা পাথর দেখতে অনেক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য। টলমলে হাঁটু পানির তলায় পাথরের গালিচা। আমার হাঁটু পর্যন্ত পানিতে ভিজে গেল আর আয়মান তো রীতিমতো গোসল করে উঠল। এখানকার সাদা রঙের পাথরগুলো নদীর পানির প্রবাহে শ্বেতশুভ্র রূপ ধারণ করেছে। সাদা পাথরের সৌন্দর্য সত্যিই অমোঘ। সূর্যের আলোতে সাদা পাথরগুলো জ্বলজ্বলে সোনালি আভা ছড়ায়, যা আমাদের মনে এক অদ্ভুত মায়া সৃষ্টি করে। স্বচ্ছ পানি আর চারপাশের সবুজ পাহাড় যেন প্রকৃতির এক মহাকাব্যিক দৃশ্যের অবতারণা ঘটায়। আমরা সাদা পাথরের উপর বসে গা জুড়িয়ে সূর্যাস্তের রং বদলানোর দৃশ্য দেখলাম। সাদা পাথর, পাহাড় আর নীলাভে পানির অপরূপ প্রকৃতি যে এত সুন্দর ও মোহনীয় হতে পারে তা সাদা পাথর রাজ্যে না গেলে বুঝতেই পারতাম না। নৈসর্গিক মনভোলানো, রোমাঞ্চকর ও আনন্দদায়ক এক ভ্রমণ।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক

[লেখাটি  লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত ]

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)