ধ্রুব ডেস্ক
নির্বাচনী সরঞ্জাম ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত জোটের সঙ্গে। জোট দুটির নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দর-বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী- জামায়াত। এবার নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে না। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দলটি নির্বাচনে নেই। ফলে যেসব আসনে অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোয় বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেসব আসনে ভোটের সমীকরণ নতুনভাবে গড়ে উঠছে। সারা দেশে এমন ৩০টির মতো আসন রয়েছে। ফলে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের সমর্থন। ফলে এই আসনগুলোর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেতে অব্যাহত নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ,মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, বাগেরহাট, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। তাদেরকে রাজি-খুশি করতে বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন প্রার্থীরা। কোথাও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কোথাও কবর জিয়ারত, আবার কোথাও নিরাপত্তা ও মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন, অনেকে কারাগারেও আছেন। সে সব এলাকায় আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিরা যেন নিরাপদে এলাকায় ফিরতে পারেন, সে ধরনের আশ্বাসও শোনা যাচ্ছে। নতুন মামলা হবে না বলেও আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের দুর্গ বিবেচিত হয় গোপালগঞ্জ জেলাটি। বিগত ১৯৯১ সাল থেকে জেলার তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেননি। চলতি নির্বাচনে এই জেলায় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে প্রকাশ্যে অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি। তবে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানান চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করছেন। এমনকি কয়েকজন প্রার্থী টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধাও জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান বক্তব্য বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি যারা নিরীহ নিরপরাধ, যারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানিমূলক মামলায় আসামি হয়েছেন, তাদেরকে মুক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবেন।
আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মাদারীপুরের তিনটি আসনই । শাজাহান খান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় নূর-ই-আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী) মতো প্রভাবশালী নেতারা ওই জেলার রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। তাই এই জেলার আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের ভোট পেতে বিএনপি ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নানা তৎপরতা চালিয়েছেন।
মাদারীপুর-১ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও লিটন চৌধুরীর পিতা ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর কবর জিয়ারত করেন। কবর জিয়ারতের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানান।প্রার্থী নাদিরা আক্তার বলেছেন, তিনি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না। যারা অপরাধ করেনি, তারা পালিয়ে থাকবে কেন বলেও তিনি প্রশ্ন রেখেছেন।
একই আসনে বিএনপির দুইজন স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারাও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
মাদারীপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া ও বিদ্রোহী প্রার্থী মিল্টন বৈদ্য। তারা সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মা–বাবার কবর জিয়ারত করেছেন। শাজাহান খান এখন কারাগারে। তার আত্মীয় ও অনুসারীরা গোপনে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের পরিবার এই আসনের প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যকে গোপনে সমর্থন করছেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা আছে। নাছিম এখন আত্মগোপনে আছেন। মাদারীপুর-৩ আসনেও আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীকে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
আওয়ামীলীগের আরো একটি ঘাঁটি শরীয়তপুর। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে শরীয়তপুরের তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। গত দেড় মাসে এই জেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলে জানাগেছে।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সখিপুর থানা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও উত্তর তারাবনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ আলী মোল্যা সখিপুরের বিভিন্ন নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। ইউনূছ আলী মোল্যার মতে, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে তিনি বিএনপিতে যোগদান ও প্রচারে অংশ নিয়েছেন।
জানুয়ারি মাসের ২৭ তারিখে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গোসাইরহাট উপজেলার অন্তত পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী ও সমর্থক শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সঙ্গে সভা করেন। ওই সভায় আওয়ামী লীগ নেতারা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন। আওয়ামী লীগের নেতা ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, দল থেকেও নির্বাচন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা নেই। এলাকার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
শুধু বিএনপি নয়, কোথাও কোথাও জামাতের প্রার্থীদেরকেও আওয়ামীলগের ভোট টানার চেষ্টা করতে শোনা যাচ্ছে। বাগেরহাটে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বলেছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না। ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় আলাদা করেও গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিএনপি ও জামায়াত,উভয় দলের প্রার্থীরাই সংখ্যালঘুদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের আধিক্য রয়েছে। তাদের ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই চেষ্টা করছে। চলতি মাসের ৪ তারিখে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাশভাংগা কালীমন্দির চত্বরে বিএনপির মহাসচিব ও এই আসনের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি সবাইকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি, আপনাদের পাশে থাকব।’ এদিন কালীমন্দির চত্বরে হাজির হন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনিও বিপদে-আপদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এড়াতে তাঁরা বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বরাবরই ফরিদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ছিল। তবে সম্প্রতি কয়েকজন আওয়ামী নেতা বিএনপির প্রার্থীর হাতে ফুল দিয়ে দলে যোগ দেন। বিএনপির প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন, যারা মামলার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়েছেন, তারা ফিরে এলে সহযোগিতা করবেন তিনি। ফরিদপুর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেছেন, যারা অন্যায় করেছে, তারা পালিয়েছে। কিন্তু যারা অন্যায়ের সাথে জড়িত ছিল না তাদেরকে তিনি ফেলতে পারবেন না। ফলে একইভাবে এই আসনের আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
জামালপুর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের সকলকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। কেউ হয়রানির শিকার হবে না বলেও তিনি আশ্বাস দেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক পদধারী নেতা প্রকাশ্যেিএখন বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আফসার আলীকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট চাইতে দেখা গেছে।
ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এড়াতে তারা বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ময়মনসিংহ-১ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ সাংবাদিকদের বলেন, দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গড়াই তার লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত আসনগুলোতে দলটির ভোট কীভাবে, কার দিকে এবং কতটা সরে যায় তার ওপর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করছে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন।