ধ্রুব ডেস্ক
সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী বিএনপি। সারা দেশে টানা নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল জনসমাগম, মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা, সাম্প্রতিক কিছু জরিপের ইঙ্গিত এবং অতীতের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে বিএনপি মনে করছে, তারা এবার সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জনসমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ভোট প্রচারণা সমাপ্তির পরে গতকাল মঙ্গলবারও ব্যস্ত সময় পার করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সারা দেশের নেতাকর্মী এবং প্রার্থীদের সাথে কথা বলেছেন টেলিফোনে, কোন এলাকায় কী অবস্থা জেনেছেন তাদের কাছ থেকে, বিদেশী সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলেছেন, দলের কার্যালয়ে এসে সাংগঠনিক কাজও করেছেন তিনি।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত প্রায় ২০ দিন বিএনপি সারা দেশে টানা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জেলা পর্যন্ত তিনি ৪৩টিরও বেশি জনসভা ও পথসভায় অংশ নিয়েছেন। এসব সভায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি বিএনপিকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করেছে। প্রচারণার শেষ দিনে ঢাকার বিভিন্ন আসনে জনসভা শেষে রাতে তিনি তার বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন তারেক রহমান। এ দীর্ঘ প্রচারণায় তারেক রহমান যেখানে গেছেন, সেখানেই সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্র্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়েছে। বগুড়া, দিনাজপুর, সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো মানুষের জনসমুদ্রে তিনি বলেছেন, এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের নয়; এটি দেশ পুনর্গঠন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন। তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ধানের শীষে ভোট মানে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তারেক রহমান বলেছেন, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, আমরা চাই ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতি। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে একটি কল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
দুর্নীতি দমনকে বিএনপি তাদের রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরব, যেকোনো মূল্যে। বিএনপির ইশতেহারে স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও পুলিশ সংস্কার, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দলটির দাবি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তরুণ সমাজকে সামনে রেখে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে। তারেক রহমান বলেছেন, যুবকরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রশিক্ষণ, গ্লোবাল ই-কমার্সে যুক্তকরণ, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ, স্টুডেন্ট লোন সহজীকরণ এবং বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
দলটির ইশতেহারে মোট ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের মাসিক সহায়তা, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও মিড-ডে মিল চালু, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষায় নদী খনন ও বৃক্ষরোপণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, মাঠের জনসমর্থন, দীর্ঘ ও সক্রিয় প্রচারণা, সুস্পষ্ট ইশতেহার এবং তরুণদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, এ সবকিছু মিলেই বিএনপিকে জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত না করলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। আমরা সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করব। বিএনপির আশা, ধানের শীষে ভোট দিয়ে জনগণ তাদের দায়িত্ব দিলে দেশে একটি নতুন যুগের সূচনা হবে, যেখানে সবার আগে থাকবে বাংলাদেশ। বিএনপির জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের দেশ পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতা। দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে সরকার পরিচালনা করেছে। বিএনপির নেতাদের দাবি, তাদের শাসনামলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। এ অভিজ্ঞতা থেকেই তারা মনে করেন, সঙ্কট মোকাবেলা ও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি সক্ষম।
আসন হিসাব নিয়েও বিএনপি আশাবাদী। দলীয় নেতাদের মতে, ঢাকা, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর বিভাগে তাদের অবস্থান শক্ত। চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও ভালো ফলের আশা করছে দলটি। রংপুর ও খুলনা বিভাগ থেকেও উল্লেখযোগ্য আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে বিএনপি।
অনেক নেতার দাবি, দলটি ২০০টির বেশি আসনে বিজয়ী হতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপেও বিএনপির এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে তারা উল্লেখ করছেন।সূত্র : নয়াদিগন্ত