ছবি: সংগৃহীত
গ্যালারিজুড়ে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া, ফুটবলপ্রেমীদের বুকের ভেতর হাহাকারের মাতম—লিওনেল মেসি অধ্যায়ের যবনিকা যে অবশেষে পড়তে যাচ্ছে! অথচ যার বিদায়ে গোটা বিশ্বের ফুটবল হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, সেই মেসি নিজে আছেন পরম স্বস্তিতে। নীল-সাদা জার্সি গায়ে ক্যাম্পের বাস থেকে যখন নামলেন, রোদচশমা, জিন্স আর আগুনের ছোঁয়া দেওয়া চুলে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল বাঁধভাঙা এক রঙিন তরুণ। বিদায়ের কোনো বিষণ্ণতা তার চোখে-মুখে নেই—এক অদ্ভুত ও চমৎকার বৈপরীত্য!
স্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো প্রিয় মহাতারকাকে দেখার জন্য লাখো চোখ অশ্রুসজল হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই যে আজ কোটি ভক্তের নয়নের মণি, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পথচলার সূচনালগ্নে এই আর্জেন্টিনাতেই তিনি কতখানি অচেনা ছিলেন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
দুই দশকের দীর্ঘ পথ পরিক্রমার আগে আর্জেন্টাইনদের কাছে মেসি ছিলেন যেন ভিনদেশের কেউ। জন্মভূমি রোসারিও ছেড়ে সুদূর স্পেনে বার্সেলোনা ক্লাবের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠছিলেন তিনি—পিতামাতার সীমাহীন ত্যাগকে সম্বল করে। নিজ দেশের জাতীয় দলের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটটিও কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
২০০৩ সালে ফিনল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। স্পেনের হয়ে জোড়া গোল করা সেস ফাব্রেগাস, যিনি লা মাসিয়াতে মেসির সতীর্থ ছিলেন, ম্যাচ শেষে আলবিসেলেস্তে প্রতিনিধিদের বিস্ময় উপহার দিয়ে জানান—স্পেন নয়, আর্জেন্টিনাকে আসলে হারিয়েছে তাদেরই দেশের এক ছেলে, যে এখন বার্সেলোনায় খেলছে এবং ফুটবল বিশ্বের এক বিস্ময় বালক! একই কথা পরে জানিয়েছিলেন স্পেনের দলের প্রধান শেফও। ব্যাস, রত্ন উদ্ধারে নামেন এএফএ-র কর্তারা। কিন্তু নাম নিয়ে শুরু হয় এক বিভ্রান্তিকর অধ্যায়—‘মেসি’ নাকি ‘মেচি’? ‘লিওনেল’ নাকি ‘লিওনার্দো’?
টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে অনুসন্ধান চালানো কর্মী ওমার সাউতো ভুল করে লিওনার্দোকে খুঁজেছেন, আবার কর্তারা ভেবেছেন ছেলেটি ইতালীয় বংশোদ্ভূত বলে নামের বানানে ‘Mecci’ লিখেছেন। বহু নাটকের পর বিভ্রান্তি কাটে, ২০০৪-এ অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে অভিষেক হয় মেসির। পরের বছর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হলেও, এরপর টুর্নামেন্টজুড়ে একক আধিপত্য দেখিয়ে ছয় গোল করে দেশকে ট্রফি জেতান তিনি।
তবুও আর্জেন্টাইনদের মন জেতা সহজ হয়নি। দেশে না খেলে স্পেনে বেড়ে ওঠার কারণে তাকে দীর্ঘদিন ‘বিদেশি’র চোখে দেখা হতো। ২০০৫-এ হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে সিনিয়র দলে অভিষেকের পর কিংবা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলের পরও সেই অপবাদ পুরোপুরি ঘোচেনি। ২০০৬ বিশ্বকাপ, ২০০৭ কোপা আমেরিকা কিংবা ২০০৮ অলিম্পিকে সোনা জয়ের মতো সাফল্য থাকলেও আর্জেন্টাইন সমর্থকরা তাকে তকমা দিয়েছিল ‘পেচো ফ্রিও’—যার অর্থ স্পিরিট বা দরদহীন খেলোয়াড়!
পরিবর্তন আসতে শুরু করে ২০১১ সালে, কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের কঠিন ম্যাচে। প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তিতে মাঠে বমি করেও যেভাবে দলকে জয় এনে দিলেন, ভক্তরা প্রথমবার তার ভেতরে লড়াকু আর্জেন্টাইন সত্তাকে আবিষ্কার করল। তবে ক্লাবের সেই অতিমানবিকে দেশের জার্সিতে রূপান্তর করার সংশয় থেকে যায়। ২০১০ বিশ্বকাপের গোলহীন ব্যর্থতা কিংবা ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে অশ্রুসজল চোখে ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা—আর্জেন্টাইনদের মন গলাতে পারেনি, বরঞ্চ জুটেছিল অবহেলা।
২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে ক্ষতবিক্ষত মেসি যখন চরম হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আলবিদা জানালেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেল। এতদিনের ভুল বোঝাবুঝি এক নিমেষে গলে ভালোবাসায় রূপ নিল। ফুটবলপ্রেমীরা বুঝতে পারলেন মেসির মূল্য; পুরো দেশ এক বাক্যে তাকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে নামল। সেই আবেগ স্পর্শ করল মেসিকেও—তিনি ফিরলেন।
যদিও ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার ধাক্কা সহ্য করতে হয়। তবে এরপরই অনভিজ্ঞ কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে জুটি বেঁধে শুরু হয় মেসির নতুন এক স্বর্ণযুগ।
২০২১ সালে মারাকানায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছর পর কোপা আমেরিকা জয়—জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির প্রথম ট্রফি উদযাপনের অনাবিল আনন্দ। এরপর মরুভূমির বুকে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়! ফাইনালের সর্বকালের সেরা রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফুটবলের চূড়ায় পৌঁছান মেসি। অর্জিত হয় সেরা খেলোয়াড়ের সম্মানও।
জয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকে ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও। তবে বয়সের ভারে ক্লান্ত শরীর নিয়েও ৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকবার লড়াইয়ে নামেন মেসি। কানসাস থেকে নিউ জার্সি—দলকে টেনে তোলেন নকআউটে। কেপ ভার্দে, মরক্কো, সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে পরাস্ত করে ফাইনালে পৌঁছায় আর্জেন্টিনা।
তবে ১৯ জুলাই ২০২৬ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের মুখোমুখি হয়ে ১-০ গোলের হারের মুখ দেখতে হয় আর্জেন্টিনাকে। এবার কিন্তু মেসির কান্নার সঙ্গে পুরো দেশ কেঁদেছিল—অশ্রুতেই লেখা হয় সম্পর্কের চূড়ান্ত মেলবন্ধন।
২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোলের পরিসংখ্যান ছাপিয়ে আজ যখন বুটজোড়া খুলে রাখার সময় এসেছে, তখন সব হিসেব-নিকেশের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন তিনি। জাতীয় দলকে কোপা-বিশ্বকাপ-কোপা জেতানো মহাতারকা বেনিন ম্যাচে মাঠে নামছেন শুধুই ভালোবাসার অনুভবে। বৈপরীত্যের এই শেষ দৃশ্যপটে আক্ষেপের বদলে স্বদেশের পূর্ণাঙ্গ ভালবাসা নিয়ে বিদায় নেওয়াটাই তো তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!