ক্রীড়া ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ক্যাঙ্গারুর দেশে গিয়ে ইতিহাস গড়ার যে রূপকথা বাংলাদেশ ক্রিকেট দল লিখে ফেলল, তা হয়তো ক্রিকেট বিশ্বের অতি বড় কল্পনাতেও ছিল না। দীর্ঘ দুই দশক আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে জয়ের পর ধারাভাষ্যকারের সেই বিখ্যাত উক্তি—'এটি রিখটার স্কেলের ওপরে চলে গেছে'—যেন নতুন করে প্রাণ পেল ডারউইনের মাটিতে। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার তাদেরই মাঠে গিয়ে দাপুটে পারফরম্যান্সে লাল-সবুজ পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র চার দিনের মধ্যে ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ।
সিরিজ শুরুর আগে বিদেশের মাটিতে কেবল 'সম্মান অর্জনের' কথা বলেছিলেন বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা। কিন্তু মাঠে নেমে কেবল সম্মানই নয়, অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো ধসিয়ে দিয়ে দাপটের সঙ্গে প্রথম টেস্ট জিতে নিয়েছে সফরকারীরা। জয়ের জন্য পাওয়া ৫৭ রানের সহজ লক্ষ্য চতুর্থ দিনে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে অনায়াসেই ছুঁয়ে ফেলে শান্ত বাহিনী।
প্রথম তিন দিনেই জয়ের ভিত
ম্যাচের শুরু থেকেই একচ্ছত্র আধিপত্য দেখায় বাংলাদেশ। প্রথম দিনে সফরকারী পেসারদের তোপে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ব্যাট হাতে তানজিদ হাসান তামিম, অধিনায়ক শান্ত এবং মুমিনুল হকদের সাবলীল ব্যাটিং বাংলাদেশকে শক্ত ভিত এনে দেয়। তৃতীয় দিনে মেহেদী হাসান মিরাজের লড়াকু ফিফটি ও লেজের সারির ব্যাটারদের দৃঢ়তায় ১৩৮ ওভারে ৪২৬ রানের পাহাড় গড়ে বাংলাদেশ। যা গত সাড়ে সাত বছরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেকোনো সফরকারী দলের সবচেয়ে বেশি ওভার খেলার রেকর্ড।
মিরাজ-তাসকিনদের বোলিং তাণ্ডব ও গ্রিনের লড়াই
২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনেই স্বাগতিকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আগের দিনের ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে খেলতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই ধাক্কা দেন তিনি; ফিরিয়ে দেন অ্যালেন কেয়ারি ও বাউ ওয়েবস্টারকে। প্যাট কামিন্সকেও শর্ট লেগে ক্যাচ বানিয়ে বিদায় করেন মিরাজ। মাঝপথে ক্যামেরন গ্রিন ও মিচেল স্টার্ক ৩৬ রানের জুটি গড়ে কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও দ্বিতীয় সেশনের শুরুতে স্টার্ককে ১৮ রানে ফেরান তাসকিন আহমেদ।
এক প্রান্ত আগলে রেখে দারুণ দায়িত্বশীলতায় টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় ও নিজ দেশের মাটিতে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন অজি অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন (১৯২ বলে ১০৫)। তবে শতকের পরপরই তাকে বোল্ড করে বাংলাদেশ শিবিরে জয়ের সুবাস এনে দেন পেসার হাসান মাহমুদ, যা ছিল ম্যাচে তার নবম উইকেট। এরপর নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের ১৫তম ৫ উইকেট শিকারের পাশাপাশি অজিদের দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে দেন মিরাজ।
সহজ লক্ষ্যে ঐতিহাসিক জয়
৫৮ রানের জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ তামিম জশ হেজেলউডের বলে বোল্ড হলেও জয়ে কোনো প্রভাব পড়েনি। দুই বাঁহাতি ব্যাটার সাদমান ইসলাম (২৫*) ও মুমিনুল হক (৩০*) দলকে নির্বিঘ্নে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। বাউ ওয়েবস্টারকে স্কয়ার কাটে বাউন্ডারি মেরে মুমিনুল হক জয়সূচক রান তুলতেই উদযাপনে মেতে ওঠে বাংলাদেশ দল। অজিদের ডেরায় ঐতিহাসিক এই জয় স্পোর্টস ইতিহাসে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।