ক্রীড়া ডেস্ক
বিদায়ী চিঠির সাথে বাবা জর্জ মেসির সাথে নিজের এই ছবিটি শেয়ার করেছেন লিওনেল মেসি ছবি: ফেসবুক/লিও মেসি
জীবনের প্রতিটি বাঁকে যিনি ছিলেন ছায়ার মতো, সেই পরম আশ্রয়স্থল বাবাকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আধুনিক ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি। সম্প্রতি পিতৃহারা হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অফিসিয়াল পেজে এক আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। শৈশবের প্রথম ফুটবল পাঠ থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষ ছোঁয়া পর্যন্ত—বাবার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা স্মরণ করে লিখেছেন এই বিদায়ী চিঠি।
মেসির আবেগঘন বার্তাটির বাংলা অনুবাদ:
"বাবা, তুমি যে আর নেই, এটা আমি এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না। আমাদের আর কখনো দেখা হবে না, একসঙ্গে বসে গল্প করা হবে না—ভাবলেই বুকটা ভেঙে যায়। আমি জানি শেষ সময়টায় তুমি ভীষণ কষ্টে ছিলে, তাই হয়তো সৃষ্টিকর্তা তোমাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু তুমি বড় অসময়ে চলে গেলে বাবা! আমাদের যে একসাথে আরও অনেক মুহূর্ত উপভোগ করা বাকি ছিল।
তুমি সবসময় চেয়েছিলে আমি যেন গত বিশ্বকাপে খেলি। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই তোমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। এবারই প্রথম কোনো বড় টুর্নামেন্টে তুমি আমার পাশে ছিলে না। মা অবশ্য আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে এবং খেলায় আমাদের সাথে যোগ দিতে পারবে। আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, আমরা ফাইনালে উঠব এবং তুমি অন্তত একটি ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে পারবে।
সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর মনের জমানো কষ্টগুলো নিয়ে তোমার কাছেই ছুটে এসেছিলাম, কারণ অন্য কারও সাথে এগুলো শেয়ার করার ভাষা আমার ছিল না। তুমি তো কিছুই উপভোগ করতে পারলে না। আমরা হয়তো এবার চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু প্রতিটা ম্যাচ যে আমরা কতটা উন্মুখ হয়ে খেলেছি, তা তুমি কখনোই জানতে পারলে না। আবারও প্রমাণ হলো—তুমিই ঠিক ছিলে। তোমার সেখানে উপস্থিত থাকা এবং খেলাটা সামনাসামনি দেখা কতটা দরকার ছিল!
আমি তোমাকে আজ এই কথাগুলো বলছি কারণ শুধু এই একটি বিষয় নিয়েই তোমার সাথে শেষবার কথা বলা হয়নি। বাকি সব তো তোমার জানা। আমার ব্যস্ততার মাঝেও আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম, সুযোগ পেলেই দেখা করতাম।
তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে সামনে এগোব, কীভাবে সবকিছু সামলাব—কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার পুরো জীবনটাই কেবল ফুটবলকে ঘিরে, কিন্তু এখন আর কতদিন খেলাটা চালিয়ে যেতে পারব, তা নিয়ে নিজের মনেই গভীর সংশয় জাগছে। একদম শুরু থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি আমার পাশে ছিলে। আর একটুখানি সময় কি তুমি ধরে রাখতে পারতে না বাবা? তাহলে তো আমরা একসাথেই এই সুন্দর যাত্রাটা শেষ করতে পারতাম!
আমি খুব ভালো করেই জানি, পরিবার, স্ত্রী এবং সন্তানদের সুখেই তোমার আসল আনন্দ ছিল। তবে সবার অজান্তে, সবচেয়ে বেশি খুশি হতে আমাকে মাঠের সবুজ ঘাসে ফুটবল খেলতে দেখলে...
ছোটবেলা থেকেই দৃশ্যটা একদম একই রকম ছিল। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে কাজ থেকে ফিরেই তুমি আমাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতে। আবার অনেক সময় তুমি কাজের জায়গায় ব্যস্ত থাকতে বলে আমি নিজেই মায়ের কাছে চলে যেতাম।
আর আমার কোনো একটা ম্যাচও তুমি কখনো মিস করোনি। গ্যালারিতে বসে আমার খেলা দেখতে গিয়ে তুমি কত যে মানসিক কষ্ট পেয়েছ, আবার কত যে আনন্দ পেয়েছ! যদিও সামনাসামনি কখনো আমাকে খুব একটা বানিয়ে প্রশংসা করতে না।
তুমি একই সাথে আমার বাবা, আমার জীবনের সেরা বন্ধু এবং আমার এজেন্ট ছিলে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে তোমার যে ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল, তুমি সেটাই করেছ—নিখুঁতভাবে, বিন্দুমাত্র ভুল না করে। মাঝে মাঝে কিছু বিষয়ে আমাদের মান-অভিমান বা বিতর্ক হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা যেত তুমিই সঠিক ছিলে। ঘুরেফিরে তোমার কথাই সত্যি হতো।
তোমাকে আমি প্রতিটা মুহূর্তে ভীষণ মিস করব বাবা। তবে তুমি সবসময় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। বিশেষ করে আমার সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তোমার ছায়া থাকবে, কারণ তুমি যেভাবে আমাকে শিক্ষা ও মূল্যবোধ দিয়ে বড় করেছ, আমিও ওদের সেভাবেই মানুষ করছি।
ওপার থেকে তুমি আমাদের দেখে রেখো বাবা, যেমনটা এখানে থাকতে সারাজীবন আগলে রাখতে। সবকিছুর জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা। ❤️"