ক্রীড়া ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
প্রিমিয়ার লিগ মানেই অদম্য উত্তেজনা, পরিবর্তন আর অনিশ্চয়তার খেলা। খেলোয়াড়দের আসা-যাওয়া, মালিকদের খামখেয়ালিপনা কিংবা রাতারাতি ক্লাবের পরিচিতি বদলে যাওয়া—সবই ইংলিশ ফুটবলের নিয়মিত দৃশ্য। তবে গত চার দশক জুড়ে এই সবকিছুর মাঝেও একদল কিংবদন্তি কোচের উপস্থিতি ছিল ধ্রুবতারার মতো। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, আর্সেন ওয়েঙ্গার, হোসে মরিনহো, ইয়ুরগেন ক্লপ কিংবা পেপ গার্দিওলা—কেবল দল গড়ে ক্ষান্ত হননি, তারা তৈরি করেছিলেন ফুটবলের একেকটি সাম্রাজ্য। এই পাঁচ কোচ মিলে প্রিমিয়ার লিগের ৩৪টি আসরের মধ্যে ২৬টিরই ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছেন।
আগামী ২০২৬-২৭ মৌসুমে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হতে যাচ্ছে। ১৯৮৫-৮৬ মৌসুমের পর এই প্রথম ডাগআউটে দেখা যাবে না ফার্গুসন, ওয়েঙ্গার, মরিনহো, ক্লপ বা গার্দিওলার কোনো একজনকে। এক সোনালী যুগের নিঃশব্দ প্রস্থান ঘটছে এবার।
নতুন মৌসুমে ডাগআউটের সমীকরণ
পরিবর্তনের এই ঝড়ে এবার রেকর্ড গড়েছে প্রিমিয়ার লিগ। মৌসুম শুরুর আগেই টুর্নামেন্টের ৯টি ক্লাব নিজেদের ডাগআউটে নতুন স্থায়ী প্রধান কোচ নিয়োগ দিয়েছে। এর আগে ২০১৬-১৭ মৌসুমে ৮টি ক্লাবে নতুন কোচ আসার রেকর্ডটি ছিল সর্বোচ্চ। এছাড়া ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে ৭টি এবং ২০১২-১৩ মৌসুমে ৬টি ক্লাব নতুন কোচের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল।
ম্যানচেস্টার সিটিতে ইনজো মারেস্কা: পেপ গার্দিওলা ক্লাব ছাড়ার পর ঐতিহাসিক এই শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইতালিয়ান কোচ মারেস্কাকে।
লিভারপুলে আন্দোনি ইরাওলা: আর্নে স্লটকে বরখাস্তের পর অ্যানফিল্ডের ডাগআউট সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
চেলসিতে জাবি আলোনসো: লিয়াম রোসেনিয়রের সংক্ষিপ্ত মেয়াদের ব্যর্থতার পর রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা ও বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা তরুণ কোচ আলোনসোকে এনেছে ব্লুজরা।
অন্যান্য বড় রদবদল: বোর্নমাউথ থেকে ইরাওলা লিভারপুলে যাওয়ায় তারা নিয়োগ দিয়েছে মার্কো রোসকে। নটিংহাম ফরেস্ট এনেছে অলিভার গ্লাসনারকে, আর গ্লাসনার ক্রিস্টাল প্যালেস ছাড়ায় সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন পিয়েরে সেজ। অন্যদিকে ফুলহ্যামে দায়িত্ব নিয়েছেন আলভারো আরবেলোয়া এবং ইপসউইচ টাউনে গ্যারি ও'নিল। এর বাইরে এডি হাউ পদত্যাগ করায় নিউক্যাসল ইউনাইটেড তাদের দায়িত্ব সোপর্দ করতে যাচ্ছে ম্যাথিয়াস জাইসেলের হাতে।
ধৈর্যের অভাব ও দ্রুত সাফল্যের চাপ
আধুনিক ফুটবলে ক্লাব কর্তৃপক্ষের ধৈর্যের যে প্রচণ্ড অভাব ঘটেছে, ডাগআউটের এই ঘনঘন পরিবর্তন তারই প্রমাণ। এখন দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রজেক্টের চেয়ে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার প্রবণতাই প্রধান হয়ে উঠেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রিমিয়ার লিগে একজন কোচের গড় মেয়াদ এখন নেমে এসেছে মাত্র ২০ মাসে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আর্সেনালের দায়িত্ব নেওয়া মিকেল আর্তেতাই এখন লিগের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোচ! অথচ মাত্র সাড়ে ছয় বছরের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেই যদি কাউকে লিগের ‘বয়োজ্যেষ্ঠ কোচ’ তকমা পেতে হয়, তবে তা ফুটবলের বর্তমান অস্থিরতার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। পুরো ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগ মিলিয়ে কেবল আতলেতিকো মাদ্রিদের দিয়েগো সিমিওনেই (২০১১ সাল থেকে) দীর্ঘ এক দশক ধরে এক ক্লাবে রয়েছেন।
প্রিমিয়ার লিগে বর্তমানে আর্তেতার পর উনাই এমেরি (অ্যাস্টন ভিলা) এবং ড্যানিয়েল ফার্কে (লিডস ইউনাইটেড) ছাড়া তিন মৌসুমের বেশি টিকে থাকার মতো কোচ হাতে গোনা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়া সান্ডারল্যান্ডের রেজিস লে ব্রিস ইতোমধ্যে লিগের চতুর্থ দীর্ঘমেয়াদি কোচ বনে গেছেন!
প্রথম মৌসুমে ট্রফি জয়ের বিরল রেকর্ড
ঘনঘন কোচ বদলালেই যে সাফল্য আসবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। গত ২০২৫-২৬ মৌসুমেই ডাগআউটে ১১টি পরিবর্তন দেখেছে প্রিমিয়ার লিগ, যার মধ্যে নটিংহাম ও টটেনহ্যাম একাধিকবার কোচ বদলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।
তাছাড়া প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘ ৩৩ বছরের ইতিহাসে অভিষেক মৌসুমেই কোনো কোচ শিরোপা জিতেছেন—এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৬ বার:
নতুন করে নতুন রূপে শুরু করতে যাওয়া ৯টি ক্লাবের ভাগ্যে এবার কী রয়েছে—অভিজ্ঞতার জয় হবে নাকি ঝরে পড়বে আরও কিছু নতুন স্বপ্ন, তার উত্তর মিলবে নতুন মৌসুমেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যে টুর্নামেন্টকে একসময় ডাইনাস্টি বা সাম্রাজ্য গড়ার মঞ্চ বলা হতো, সেই প্রিমিয়ার লিগ এখন শুধুই টিকে থাকার লড়াই।