ক্রীড়া ডেস্ক
লিওনেল স্কালোনি ছবি: গেটি ইমেজেস
২০১৮ সালের আগস্ট মাস। রাশিয়া বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর রীতিমতো দিশেহারা আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। ঠিক সেসময় শূন্যস্থান পূরণের জন্য কেবল 'অন্তর্বর্তীকালীন' বা কেয়ারটেকার কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনির হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল এএফএ। শীর্ষ পর্যায়ে কোচিং করানোর কোনো হাই-প্রোফাইল অভিজ্ঞতাই তখন তাঁর সিভিতে ছিল না। তবে কে জানত, স্রেফ সময়ের প্রয়োজনে ‘অস্থায়ী’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সেই মানুষটিই হয়ে উঠবেন আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি অধ্যায়ের প্রধান রূপকার!
সদ্যই জাতীয় দলের ডাগআউটে নিজের ১০০তম ম্যাচের মাইলফলক ছুঁয়েছেন স্কালোনি। তাঁর এই সেঞ্চুরির পরিসংখ্যান যেকোনো ফুটবল-বোদ্ধাকেই চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ১০০ ম্যাচে জয় এসেছে ৭২টিতে, ড্র ১৯টি আর হার মোটে ৯টিতে! এই সময়ে তাঁর শিষ্যরা প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়েছে ২০৯ বার, বিপরীতে গোল হজম করেছে মাত্র ৫২টি। আধুনিক ফুটবলে এমন রেকর্ড রীতিমতো অবিশ্বাস্য। তবে স্কালোনির শ্রেষ্ঠত্ব কেবল এই সংখ্যার বৃত্তে আটকে নেই; তাঁর আসল ম্যাজিক হলো—খাদের কিনারা থেকে আত্মবিশ্বাস হারানো একটা দলকে টেনে তুলে আবারও জেতার স্বপ্ন দেখাতে শেখানো।
এই অবিশ্বাস্য রূপকথার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল আরও আগে।
ফ্ল্যাশব্যাক ২০১৬। কোপা আমেরিকার ফাইনালে আরও একবার হৃদয়ভাঙার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, "জাতীয় দল আমার জন্য শেষ।" সেদিন গোটা বিশ্বের কোটি ভক্তের মতো টিভিপর্দায় কষ্ট পেয়েছিলেন সদ্য বুটজোড়া তুলে রাখা সাবেক ডিফেন্ডার স্কালোনিও। তিন দিন পর চিলির ৯ জন খেলোয়াড়ের মাঝখানে মেসির একা বল নিয়ে লড়াই করার একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তিনি ক্যাপশনে লিখেছিলেন, "যেও না, লিও।"
ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা! সেদিনের সেই আকুতি জানানো স্কালোনিই আজ এমন এক জাদুকর, যাঁর কাঁধে ভর করে মেসি শুধু জাতীয় দলেই ফিরেননি, একে একে ছুঁয়ে দেখেছেন ক্যারিয়ারের সব অধরা ট্রফি।
ফুটবলে ভাগ্যের একটা ভূমিকা থাকে ঠিকই, কিন্তু স্কালোনির এই যাত্রাকে কেবল 'লাক' বললে তাঁর ট্যাকটিক্যাল মস্তিষ্কের প্রতি অবিচার করা হবে। শুরুর দিকে তাঁকে নিয়ে সমালোচনার অন্ত ছিল না। অনভিজ্ঞ এক কোচ কীভাবে এতো বড় ড্রেসিংরুম সামলাবেন—এমন প্রশ্ন ছিল সবার মুখে। কিন্তু স্কালোনি কথায় নয়, জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে।
দলের চেহারা বদলে ফেলেছেন দারুণ দক্ষতায়। অভিজ্ঞদের যেমন যোগ্য সম্মান দিয়েছেন, তেমনি এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা নাহুয়েল মোলিনাদের মতো তরুণ প্রতিভাদের ওপর রেখেছেন অগাধ আস্থা। স্কালোনির জহুরির চোখ তাঁদের চিনতে ভুল করেনি, আর তাঁরাও গুরুর আস্থার প্রতিদান দিয়ে হয়ে উঠেছেন দলের একেকটি জাদুকরী অস্ত্র।
তবে স্কালোনির সবচেয়ে বড় মাস্টারস্ট্রোক হলো দলের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। একসময় আর্জেন্টিনা মানেই ছিল পাহাড়সম চাপ আর ফাইনালে এসে খেই হারিয়ে ফেলার এক অজানা আতঙ্ক। কিন্তু বর্তমান দলটা পিছিয়ে পড়লেও প্যানিক করে না। পরিস্থিতি যত কঠিন হয়, মাঠের ভেতর দলটা থাকে ততটাই শীতল আর শান্ত। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর অধীনে দল গড়ে প্রতি ম্যাচে অর্ধেক গোলও হজম করেনি।
মাঠের বাইরের ড্রেসিংরুমেও তিনি তৈরি করেছেন এক দারুণ কমফোর্ট জোন। সেখানে মেসি কেবল একজন অতিমানবীয় অধিনায়ক নন, দলেরই একজন সাধারণ সদস্য। তরুণরা তাঁর পাশে খেলতে নেমে স্নায়ুচাপে ভোগার বদলে অনুপ্রাণিত হয়। বেঞ্চে থাকা খেলোয়াড়টিও জানেন, সময়মতো তাঁরও সুযোগ আসবে। এ কারণেই স্কালোনির দলটিকে এখন অনেকেই শুধু ‘টিম’ না বলে একটি ‘পরিবার’ বলতে ভালোবাসেন।
দিনশেষে অবশ্য ফুটবলে ট্রফিটাই শেষ কথা বলে। ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা জয়, এরপর ফিনালিসিমা, কাতার বিশ্বকাপ এবং সবশেষ ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা! মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিশ্ব ফুটবলের একচ্ছত্র অধিপতি এখন আর্জেন্টিনা।
১০০ ম্যাচের এই মাইলফলক তাই স্কালোনির কাছে শুধুই একটি সংখ্যা নয়। এটি প্রমাণ করে, ফুটবলের সেরা গল্পগুলো অনেক সময় সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত চিত্রনাট্যেই লেখা হয়। ২০১৬ সালে এক সাবেক ফুটবলার লিখেছিলেন, "যেও না, লিও।" আজ, ১০০ ম্যাচ পর, ফুটবল বিধাতা যেন সেই চাওয়ার শতভাগ পূর্ণতা দিয়েছেন। মেসিও থেকে গেছেন, স্কালোনিও থেকে গেছেন। আর এই দুই 'লিওনেল' মিলে চিরতরে বদলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনা ফুটবলের পুরো ইতিহাস!