ক্রীড়া ডেস্ক
এনজো ফার্নান্দেস ত্রাতা হয়ে রক্ষা করেছেন চেলসিকে ছবি: গেটি ইমেজেস
লিয়াম রোজেনিয়রের অধীনে যে এনজো ফার্নান্দেস ছিলেন এক হতাশায় ঘেরা নাম, সেই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারের জাদুতেই চেলসি এখন এফএ কাপের ফাইনালে। রোজেনিয়রের কোচ হিসেবে সেই ব্যর্থ ১০৬ দিনের শাসনামলে এনজোর পারফরম্যান্স ছিল যাচ্ছেতাই, কিন্তু ভাগ্যচক্রে সেই এনজোই এখন ক্লাবটির ত্রাতা।
মূলত এক ম্যানেজারের কাছে যিনি ছিলেন 'ভিলেন', অন্য ম্যানেজারের অধীনে তিনিই হয়ে উঠলেন 'নায়ক'। এনজোর প্রথমার্ধের একমাত্র গোলটি অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ক্যালাম ম্যাকফারলেনকে নিয়ে গেল স্বপ্নের ফাইনালে। ম্যাচ শেষে ম্যাকফারলেন বলেন, "এনজোর সবচেয়ে বড় গুণ হলো সে একজন লড়াকু সৈনিক। সবসময় নিখুঁত গেম প্ল্যান লাগে না; মাঠের লড়াই আর জেদই অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়।"
স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে মাত্র ১০৬ দিন দায়িত্ব পালন করার পর গত বুধবার বরখাস্ত হওয়া রোজেনিয়র হয়তো এই মন্তব্য শুনে একটু বাঁকা হাসিই হাসবেন। লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ওয়েম্বলির এই ১-০ গোলের জয়টি তিনি টিভিতে দেখেছেন কি না জানা নেই, তবে দেখে থাকলে নিজের সাবেক শিষ্যদের এমন বদলে যাওয়া পারফরম্যান্স দেখে তিনি রীতিমতো অবাক হতেন।
তালিকার সবার উপরে থাকবেন এনজো ফার্নান্দেস। ১০৬ মিলিয়ন পাউন্ডের এই বিশ্বকাপ জয়ী তারকা চেলসির দামী স্কোয়াডের অমিত সম্ভাবনার প্রতীক, আবার বড় হতাশার কারণও। কখনো তিনি অতি উজ্জ্বল, আবার কখনো একদম নিস্পৃহ। রোজেনিয়র কখনোই এনজোর এই খামখেয়ালি রূপ বদলাতে পারেননি। রিয়াল মাদ্রিদ বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাবে যাওয়ার গুঞ্জন থাকলেও রোজেনিয়রের অধীনে তাকে কখনোই সেই মানের খেলোয়াড় মনে হয়নি।
মজার ব্যাপার হলো, রিয়াল মাদ্রিদ এবং এনজো মারেস্কার বরখাস্ত হওয়া নিয়ে মন্তব্য করায় এনজোকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধও করেছিলেন রোজেনিয়র। সেই তিক্ত সম্পর্কের রেশ কাটিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ম্যাকফারলেনের অধীনে প্রথম ম্যাচেই যেন পুনর্জন্ম হলো এই মিডফিল্ডারের।
টানা পাঁচ ম্যাচে হার এবং কোনো গোল করতে না পারার ব্যর্থতায় চেলসির চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্বপ্ন আগেই শেষ হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত রোজেনিয়রের চাকরি কেড়ে নিয়েছে। সেই ব্যর্থতার মিছিলে এনজো, কোল পালমার, মার্ক কুকুরেয়াদের পারফরম্যান্স নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কিন্তু লিডসের বিপক্ষে চেলসি দেখালো তাদের আসল জাত।
ম্যাচের ২৩ মিনিটে পেদ্রো নেতোর ক্রস থেকে এনজোর হেডটিই ছিল জয়সূচক গোল। তবে গোল ছাড়াও পুরো ম্যাচে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে তিনি যেভাবে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা ছিল দেখার মতো। রোজেনিয়র যা করতে পারেননি, ম্যাকফারলেনের অধীনে এনজো ঠিক সেটাই করে দেখালেন—মাঠের ভেতরে প্রকৃত নেতার ভূমিকা পালন করলেন।
ম্যাচের এক পর্যায়ে যখন লিডসের কোচ দানিয়েল ফার্কে ফরমেশনে পরিবর্তন আনেন, তখন এনজোই গোলরক্ষক রবার্ট সানচেজকে নির্দেশ দেন চোটের অভিনয় করে মাঠে শুয়ে পড়তে, যাতে সেই বিরতিতে পুরো দল নতুন কৌশল বুঝে নিতে পারে। এই চতুরতা এবং নেতৃত্বই বলে দেয় এনজো এখন কতটা পরিণত।
চেলসির মালিকপক্ষ ব্লু-কো এবং তাদের পাঁচজন স্পোর্টিং ডিরেক্টর গত সপ্তাহে রোজেনিয়রকে সরিয়ে যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, এফএ কাপের ফাইনাল নিশ্চিত হওয়াতে সেই সিদ্ধান্ত আপাতত সঠিক বলেই মনে হচ্ছে।
সামনে এখন পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি। যারা ঘরোয়া ট্রেবল জয়ের মিশনে আছে, তাদের বিপক্ষে চেলসি কতটা সুবিধা করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে গত গ্রীষ্মে পিএসজিকে হারিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপ জেতা এই দলটি যদি নিজেদের সেরাটা দিতে পারে, তবে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষকেই রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। গার্দিওলা নিশ্চয়ই এনজোর এই বিধ্বংসী রূপ দেখে কিছুটা চিন্তিত থাকবেন। তবে সবকিছু নির্ভর করছে চেলসির খেলোয়াড়দের মানসিকতার ওপর—তারা কি জয়ের ক্ষুধা নিয়ে নামবে, নাকি আবারও নিজেদের ইগোতে পথ হারাবে?
ম্যাকফারলেনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলোয়াড়দের এই ছন্দ ধরে রাখা। কারণ রোজেনিয়র হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, চেলসির এই তারকাখচিত স্কোয়াডকে সামলানো যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ঠিক ততটাই কঠিন।