রফিক মন্ডল
বিগত ১৪টি বছর। কারো কাছে এটি কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো কিছু সাধারণ সংখ্যা, কিন্তু আমার কাছে? আমার কাছে এই এক যুগাধিক সময় ছিল এক জীবন্ত জাহান্নাম। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বিষাক্ত মিথ্যা অপবাদ আর ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে একটি সম্মানিত পরিবারকে তিল তিল করে পিষে মারার যে নীল নকশা করা হয়েছিল, আজ তার দহন বুকে নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি— “আমি নাকি কেউ না!”
ফেরারি জীবনের স্মৃতি
দীর্ঘ ১৪ বছর আমাকে দাগি আসামির মতো ফেরারি হয়ে পথে পথে যাযাবরের মতো ঘুরতে হয়েছে। নিজ দেশে, নিজ আলো-বাতাসে আমি ছিলাম এক ভয়ার্ত চোর-পুলিশ খেলার শিকার। র্যাব-৬ ঝিনাইদহের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের লোহার গারদের পেছনে কেটেছে আমার কত নির্ঘুম রাত। ২০১২ আর ২০১৮—এই দুটি সাল আমার জীবনের মানচিত্র থেকে যেন সব আনন্দ শুষে নিয়েছিল। পুলিশ বারবার আমার শান্ত ঘরটি তছনছ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষত? আমার কলিজার টুকরো মেয়ের বিয়েতে পর্যন্ত একজন বাবা হিসেবে উপস্থিত থাকার অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই অপরাধে কি আজ কেউ লজ্জিত?
কলম আর জীবন
পেশায় সাংবাদিক হয়েও আমাকে প্রতি মুহূর্তে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হয়েছে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ ‘প্রিয় দাদাভাইরা’ যখন আমার ওপর জঙ্গিবাদের তকমা লেপে দিয়েছিল, তখন সাংবাদিকতা নয়, বরং বেঁচে থাকাই ছিল অলৌকিক এক যুদ্ধ। এলাকার মানুষের ভালোবাসা নিয়ে একটি স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েও আমি দায়িত্ব নিতে পারিনি। কারণ ক্ষমতার মদমত্ততায় তারা আমার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। সেই হারানো দিনগুলোর ক্ষতিপূরণ কি কেউ দিতে পারবে?
অর্ধাঙ্গিনীর চোখে অশ্রু
অবিচার শুধু আমার ওপরই আসেনি, তারা রেহাই দেয়নি আমার সহধর্মিণী মোছা. নাজমা খাতুনকেও। স্বামী-স্ত্রী দুজনকে একসাথে ‘জঙ্গি’ সাজানোর এক ঘৃণ্য নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। আমার নিরপরাধ স্ত্রীকে ৪টি সাজানো মামলায় টানা ৪৯ দিন জেল খাটতে হয়েছে। অন্ধকার সেল আর লোহার শিকের ওপারে কাটানো তার সেই যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তগুলোর বিচার কি এই পৃথিবীতে হবে না?
‘কেউ না’ হয়ে থাকা
দুর্দিনে যাদের ছায়া হতে চেয়েছিলাম, দলের সেই তথাকথিত অনেক বীর সেনানী তখন আমার ফোন ধরার সাহসটুকুও পাননি। অথচ আজ যখন সুসময়, তখন চারপাশে ‘ত্যাগী’ আর ‘আসল’ নেতাদের মহোৎসব! দীর্ঘ ২০ বছরের চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী আমার প্রিয় নেতা। আজ যখন ক্ষমতার দাপটে আমার চরিত্র হনন করা হয়, তখন অস্ফুট স্বরে শুনতে হয়— “আমি নাকি কেউ না!” যার রক্ত আর শ্রমের এই পথ চলা, আজ সে-ই নিজ ঘরে পরবাসী।
বিচার সঁপেছি
হাতে সমস্ত প্রমাণ আর হৃদয়ে আগ্নেয়গিরি নিয়েও আমি আজ নীরব। পৃথিবীর নশ্বর আদালতের ওপর আস্থা হারিয়ে আমি আমার সমস্ত আর্তনাদ আর হাহাকার পরকালের বিচারকের কাছে সঁপে দিয়েছি।
হে খোদা, তুমিই তো অন্তর্যামী। তোমার ইজ্জতের কসম, আমার প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আর অপমানের দলিল তোমার দরবারে পেশ করলাম। হাশরের সেই কঠিন ময়দানে তুমিই আমার অভিভাবক। সেদিন সব সত্যের আবরণ উন্মোচন করে এই ক্ষতবিক্ষত মনটাকে শান্ত করে দিও।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ