এম জামান
ছবি: ধ্রুব নিউজ
বয়সের ভারে শরীরটা ভেঙে পড়েছে। চোখেও দেখেন না কিছুই। স্পষ্ট করে বলতে পারেন না নিজের নাম কিংবা ঠিকানাও। গত এক সপ্তাহ ধরে যশোর সদর উপজেলার খাজুরা বাসস্ট্যান্ড নিউমার্কেট মহাসড়কের পাশে রজনীগন্ধা ১০ তলা ভবন সংলগ্ন এলাকায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অজ্ঞাত পরিচয়ের এই অন্ধ ও অসহায় বৃদ্ধা।
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত দিন আগে দুই-তিনজন ব্যক্তি ওই বৃদ্ধাকে খাজুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। স্থানীয়রা তখন তাদের পরিচয় এবং কেন তাকে সেখানে রাখা হচ্ছে তা জানতে চাইলে, তারা নিজেদের একটি বাসের হেলপার হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা দাবি করে, বাসের ভেতরে অজ্ঞাত কোনো যাত্রী ওই বৃদ্ধাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। তাই তারা বৃদ্ধাকে বাস থেকে নামিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে। এরপর থেকেই তিনি ওই স্থানে পড়ে আছেন। অসহায় এই নারীর করুণ অবস্থা দেখে উদ্বেগ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার পাশেই খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছেন বৃদ্ধা। দৃষ্টিহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা ও বার্ধক্যের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলোও করতে অক্ষম। পরিচয় কিংবা পরিবারের কোনো তথ্য জানতে চাইলে কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তার।
তবে এই অমানবিকতার মাঝেও আলো জ্বেলেছেন স্থানীয় কয়েকজন মানবিক ব্যক্তি। তারা বৃদ্ধার জন্য খাবার ও একটি মশারির ব্যবস্থা করেছেন। তবে প্রতিনিয়ত রোদ, বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে রাস্তার পাশে পড়ে থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাকে। রাতে পথকুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর বিচরণ থাকায় তার নিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “সাত দিন ধরে এই বৃদ্ধা রাস্তার পাশে পড়ে আছেন। তিনি নিজের খাবারও নিজে খেতে পারেন না। আমার স্যার একটি মশারি কিনে দিয়েছেন, আমি সেটি টাঙিয়ে দিয়েছি। তার খাবারের ব্যবস্থাও করছি। এমনকি রাস্তার পাশে তার মলমূত্র পরিষ্কার করার কাজও আমাকে করতে হচ্ছে। একজন অসহায় মানুষকে এভাবে ফেলে রাখা খুবই কষ্টের।”
পাশের এক দোকানদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “ছয়-সাত দিন আগে দুই-তিনজন ব্যক্তি এসে এই মহিলাকে এখানে রেখে যায়। আমরা জিজ্ঞাসা করলে তারা নিজেদের গাড়ির হেলপার পরিচয় দেয় এবং চলে যায়। একটি পরিবার কীভাবে এমন অমানবিক কাজ করতে পারে, তা ভাবতেই কষ্ট হয়।”
এই পথ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী পথচারী আব্দুস সালাম বলেন, “আমি নিয়মিত এই পথ দিয়ে যাতায়াত করি। পাঁচ-সাত দিন ধরে এই বৃদ্ধাকে একই স্থানে পড়ে থাকতে দেখছি। ঝড়-বৃষ্টি আর রাতের আঁধারে তিনি দিন কাটাচ্ছেন। এটি সত্যিই জাতির জন্য লজ্জাজনক। আমরা চাই সরকার তাকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিক এবং যারা তাকে এখানে ফেলে গেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।”
স্থানীয়দের মতে, একটি মানবিক সমাজ গঠনে অসহায় ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবার নৈতিক দায়িত্ব। খাজুরার এই অন্ধ ও অসহায় বৃদ্ধার জীবন রক্ষায় এখন প্রয়োজন প্রশাসন, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের মানবিক ও বিত্তবান মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা বৃদ্ধার সুচিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয়, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।