ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
বাংলাদেশ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো এর ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত। অর্থনৈতিক গতিশীলতা রক্ষা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি সবল, শৃঙ্খলিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং খবরের কোনো বিকল্প নেই। অথচ, গত দুই দশকে আমাদের এই সম্ভাবনাময় খাতটি ধীরে ধীরে কয়েকটি চিহ্নিত পরিবার ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত দিয়ে পরিচালিত বেসরকারি ব্যাংকগুলো আজ বহুলাংশে একেকটি 'পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে' পরিণত হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে গুটিকয়েক পরিবারের একচ্ছত্র প্রভাব, আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে শেয়ার বণ্টন, এবং আন্তঃব্যাংক ঋণের নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাচার—সব মিলিয়ে এক বিষাক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ‘পরিবারতন্ত্রের’ অশুভ ছায়া থেকে ব্যাংক খাতকে বের করে আনতে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত হস্তক্ষেপ সময়ের দাবি।
পরিবারতন্ত্রের শিকড় ও বর্তমান চিত্র
উৎপাদনমুখী ব্যবসা পরিচালনা আর ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা এক জিনিস নয়। শিল্পকারখানায় উদ্যোক্তার নিজস্ব মূলধন সিংহভাগ থাকে, কিন্তু ব্যাংকে পরিচালকদের মূলধন মূল আমানতের মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশের বেশি নয়। বাকি ৯৫ শতাংশেরও বেশি অর্থ সাধারণ আমানতকারীদের। অথচ, দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্যাংক কোম্পানি আইনের বারবার বিতর্কিত সংশোধনীর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পরিবারকে বছরের পর বছর ব্যাংকের কর্তৃত্ব ধরে রাখার আইনি সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে।
একসময় ব্যাংক কোম্পানি আইনে নিয়ম ছিল—এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক হতে পারবেন এবং তাঁরা পরপর দুই মেয়াদের (ছয় বছর) বেশি দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। কিন্তু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পরামর্শে আইন সংশোধন করে এক পরিবার থেকে পরিচালক সংখ্যা বাড়িয়ে চারজনে উন্নীত করা হয় এবং মেয়াদ বাড়িয়ে টানা ৯ বছর থেকে ১২ বছর পর্যন্ত করা হয়েছিল। ফলে, পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান, এমডি বা প্রভাবশালী পরিচালকদের সন্তান, ভাই, স্ত্রী কিংবা নিকটাত্মীয়দের স্থান পাওয়া নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। এর সরাসরি পরিণতি হিসেবে ব্যাংকগুলোতে পেশাদারত্বের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে 'পরিবারিক আনুগত্য'।
পরিবারতন্ত্র কীভাবে ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করছে
ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারতন্ত্র কেবল একটি প্রশাসনিক বা আইনি সমস্যা নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে প্রধানত নিচের কয়েকটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়-
১. পরিচালক ঋণ ও বেনামি ঋণের মহোৎসব :
একই পরিবারের একাধিক সদস্য বোর্ডে থাকায় তাঁরা একে অপরের অনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। এর ফলে 'এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার' মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা গেছে কোনো প্রকার যৌক্তিক বন্ধকী বা 'ক্লিয়ারেন্স' ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
২. স্বাধীন পরিচালকদের (Independent Directors) নিষ্ক্রিয়তা :আইন অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংকে স্বাধীন পরিচালক রাখার নিয়ম থাকলেও, বাস্তবতায় তাঁদের নির্বাচন করেন প্রভাবশালী পরিচালকরাই। ফলে তাঁরা বোর্ডে কেবল আলংকারিক ভূমিকা পালন করেন। আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় কোনো স্বাধীন মতামত বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তাঁরা ব্যর্থ হন।
৩. পেশাদার ব্যাংকারদের হাত-পা বেঁধে ফেলা :
একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্বাধীনভাবে ঋণ অনুমোদন ও নীতি বাস্তবায়ন করবেন—এটাই নিয়ম। কিন্তু পরিবারতন্ত্রের কারণে এমডিদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় পরিচালনা পর্ষদের অবৈধ আদেশ বাস্তবায়ন করা। যেসব ব্যাংকার অনিয়মের প্রতিবাদ করেন, তাঁদের চাকরিচ্যুত হতে হয় বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
৪. আন্তর্জাতিক বাজারে ইমেজের ক্ষতি :
পারিবারিক প্রভাবে দেদারসে ঋণ জালিয়াতি ও তা বিদেশে পাচার হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের আর্থিক খাতের (Credit Rating) মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের এলসি (Letter of Credit) গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করছে, যা আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি।
পরিবারতন্ত্রের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক ক্ষতির খতিয়ান
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে গত দেড় দশকে বড় ২৪টি জালিয়াতির মাধ্যমেই ৯২,২৬১ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এস আলম, বেক্সিমকোসহ মাত্র কয়েকটি পারিবারিক অলিগার্ক গ্রুপই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বেনামি ঋণের নামে প্রায় ২.৫ লাখ কোটি টাকা (২৫ বিলিয়ন ডলার) বের করে নিয়ে গেছে। পরিবারতন্ত্র ও বেনামি ঋণের প্রভাবে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর শেষে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৩.৪৫ লাখ কোটি টাকা (২০%-এর বেশি) ছাড়িয়ে যায়, যা পুনর্গঠিত দুর্বল ব্যাংকগুলোর নিরীক্ষা সম্পন্ন হলে ৩০-৩৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে।
পরিবারতন্ত্রের কারণে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে এস আলম গ্রুপ ২০১৭ সালে পর্ষদ দখলের পর ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫০%-এর বেশি (প্রায় ৭৫,০০০ থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকা) একক একটি পরিবার ও তাদের বেনামি প্রতিষ্ঠানে বের করে নেওয়া হয়। সম্প্রতি দুদক শুধু একটি ঘটনাতেই ১০,৪৭৯ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা দায়ের করেছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সিংহভাগ বিনিয়োগই পারিবারিক বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেওয়া হয়, যার পরিমাণ ২৪,০০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে রয়েছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL) ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে
বেনামি ঋণের মাধ্যমে ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে তুলে নিয়ে খেলাপিতে পরিণত করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (NBL) থেকে সিকদার পরিবারের আধিপত্যের কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছিল মোট ঋণের ৫০%-এর বেশি (প্রায় ২৮,০০০ কোটি টাকা)।
ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) পারিবারিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারে প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার জালিয়াতি ঘটে, যা ব্যাংকটিকে দেউলিয়া পরিস্থিতির মুখে ফেলে। পরে সরকারি আমানত দিয়ে এটি টিকিয়ে রাখা হয়।
কেনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন
বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের একমাত্র আর্থিক খাতের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম রোধ করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপ ও অলিগার্কদের প্রভাবে নমনীয় নীতি অবলম্বন করেছে। কখনো কখনো 'নিয়ম শিথিল' করে খেলাপিদের পুনরায় নতুন ঋণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা প্রকারান্তরে পরিবারতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তবে,এ দেশের অর্থনীতিকে যদি বড় ধরনের ধস থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এখনই 'নখদন্তহীন বাঘ'-এর ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি এখনই দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তবে আমানতকারীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব।
সমস্যা সমাধানে সুপারিশ ও বাস্তবায়নের পথরেখা
ব্যাংক খাত থেকে পরিবারতন্ত্রের অশুভ প্রভাব চিরতরে দূর করতে নিচের পদক্ষেপগুলো আশুবাস্তবায়ন করা প্রয়োজন-
১. ব্যাংক কোম্পানি আইনের আমূল সংস্কার :
পরিচালক সংখ্যা সীমিতকরণ : এক পরিবার থেকে পরিচালনা পর্ষদে সর্বোচ্চ একজনের বেশি সদস্য রাখা যাবে না।
মেয়াদ হ্রাস: পরিচালকদের মেয়াদ টানা ৩ বছরের বেশি হওয়া উচিত নয় এবং এক মেয়াদের পর অবশ্যই নির্দিষ্ট সময় (কমপক্ষে ৩ বছর) বিরতি বাধ্যবাধকতামূলক করতে হবে।
২. ব্যাংকগুলোকে পর্ষদ পুনর্গঠন ও অধিগ্রহণ :
যেসব ব্যাংকে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিবার সমস্ত শেয়ার কুক্ষিগত করে রেখেছে, সেসব ব্যাংকের পর্ষদ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রশাসক নিয়োগ করে বা অভিজ্ঞ পেশাদারদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পর্ষদ গঠন করে ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন করতে হবে।
৩. স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের কেন্দ্রীয় পুল তৈরি :
ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ যেন নিজেদের পছন্দের মানুষকে স্বাধীন পরিচালক বানাতে না পারে, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টরস পুল' বা প্যানেল গঠন করতে হবে। সেখান থেকে লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
৪. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা :
পরিবারতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ 'আর্থিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' গঠন করা প্রয়োজন। শুধু পদচ্যুত করা নয়, তাঁদের পারিবারিক ও ব্যক্তিসম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতার স্পষ্ট বিভাজন :
পর্ষদের কাজ হবে শুধুই নীতি নির্ধারণ করা (Policy Formulation)। কোনো সুনির্দিষ্ট ঋণ অনুমোদন বা দৈনিক কার্যক্রমে পরিচালনা পর্ষদের হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এটি লঙ্ঘন করলে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
একটি দেশের অর্থব্যবস্থা হলো তার রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। রক্ত সঞ্চালনে কোনো বাধা বা বিষাক্ত উপাদান ঢুকলে পুরো শরীর যেমন অচল হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি ব্যাংকিং খাতের ওপর কতিপয় পরিবারের আধিপত্য পুরো অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।
সাধারণ মানুষ তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখেন এই বিশ্বাসে যে তাঁদের অর্থ নিরাপদ। পরিচালনা পর্ষদের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা পরিবারের বিলাসী জীবনযাত্রা ও টাকা পাচারের দায় আমানতকারীরা কেন নেবেন? এখন সময় এসেছে 'পরিবারতন্ত্র' এবং 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম'-এর শৃঙ্খল ভেঙে ব্যাংক খাতকে পেশাদারিত্ব ও সুশাসনের ধারায় ফিরিয়ে আনার। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সাহসিকতার সাথে আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংক খাতকে বাঁচানো মানে কেবল কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা