ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
ছবি: ধ্রুব নিউজ
জুলাই মাসের আকাশটা যেন কোনো এক অশুভ সংকেত বহন করে আনছিল। প্রতিদিনের সূর্যোদয় আমাদের জন্য নিয়ে আসছিল নতুন কোনো মৃত্যুর খবর, রাজপথের উত্তাপ আর স্বৈরাচারের হুংকার। এই উত্তাল দিনগুলোতে আমরা যখন শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করছিলাম, মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা কেবল একটি জেলখানা। জুলাইয়ের দিনগুলো গড়িয়ে আগস্টে পড়ল, কিন্তু শেষ হয়েও যেন শেষ হচ্ছিল না। জুলাই তখন ৩৬ দিনের এক দীর্ঘ উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে। আমার হৃদয়ের গভীরে এক তীব্র হাহাকার কাজ করছিল, যা সম্ভবত প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষেরই হওয়ার কথা, আমরা কি আসলেই দ্বিতীয়বার স্বাধীন হতে চলেছি? নাকি এই রক্তস্রোত আবারও কোনো কালরাত্রিতে গিয়ে মিশবে?
আগের দিন রাতে, অর্থাৎ ৩৫ জুলাইয়ের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতে চোখে ঘুম ছিল না। একজন লেখক হিসেবে আমি নিজেকে খুব অসহায় বোধ করছিলাম। নব্বইয়ের দশক থেকে লেখালেখি করছি, কবিতার শব্দে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু এই জুলাইয়ের বিপ্লবে, যখন বাংলার তরুণ প্রজন্ম বুকের পাঁজরে গুলির দাগ নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলছে, তখন আমি আমার পড়ার টেবিলে কী করছি? আমার কি কোনো দায় নেই? আমি তো কবি, আমার কলম কি কেবল কাগজের পাতাতেই বন্দি থাকবে? এই অপরাধবোধ আমাকে ভেতর থেকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল।
মধ্যরাতে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসলাম। নীল আলোতে আমার ছায়াটা দেয়ালে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছিল। লিখতে শুরু করলাম, ’নীলনদ হয়ে খুনীদের ডাকছে বাংলার নদী।’ এই শিরোনামটা মাথায় আসতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল হাজার বছরের ইতিহাসের সব দম্ভ চূর্ণ হওয়ার দৃশ্য। নমরুদ, ফেরাউন-তারা আজ কোথায়? প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে যারা নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেছিল, তাদের পতন তো মাটির নিচে লেখা ছিল।
আমি সাউন্ড অফ জুলাই, অর্থাৎ জুলাইয়ের শব্দগুলো আমার কানে শুনতে পাচ্ছিলাম। সেটা ছিল গুলির শব্দ, চিৎকার, আর তারুণ্যের জয়ের ধ্বনি। আমি লিখলাম:
সাউন্ড অফ জুলাই-জুলাইয়ের শব্দ যখন কানে আসছে, তখন আমি মৃত, নির্বাক। আমার হৃদয় মরে পড়ে আছে, বন্ধুরা যখন কাব্য করছে উদ্দীপ্ত তারুণ্যে, তখন আমিই একমাত্র দর্শকের সারিতে দাঁড়িয়ে!
বুকের ভেতর অগ্নিকুণ্ড জ্বলছিল, আর মনে পড়ছিল ইবরাহিম (আ.)-এর সেই পরীক্ষার কথা। মহানবির যুগের কবি হাসসান ইবন ছাবিত (রা.) যখন মদিনায় সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অগ্রনায়ক ছিলেন, সেই স্মৃতি আমাকে সাহস জোগাল। আমাদের আজকের তরুণ বিপ্লবীরাও তো এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধে লিপ্ত। তারা কেবল অনাচারের বিরুদ্ধে নয়, তারা মিথ্যার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। আমি উহুদ যুদ্ধের সেই ইতিহাস মনে করলাম। নবিজি (সা.)-এর ফুফু ছাফিয়া (রা.) যেমন সাহসের প্রতিমূর্তি ছিলেন, আমাদের ছাত্ররা তেমনই। কবি হাসসানের বর্ণনায় যে চেতনা, তা আমার কলমকে সচল করে তুলল। ফেরাউনের সেই নীল নদ আজও যেন আমাদের পদ্মা-মেঘনা হয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, ভূমধ্যসাগর কি তবে বঙ্গোপসাগর হয়ে যাবে? না, এই রক্ত বৃথা যেতে পারে না। আমি আমার কবিতায় লিখলাম:
আমি সেই জালিমদের ইতিহাস জানি, স্বজাতিকেই হত্যা করত নমরুদ, স্বজাতিকেই হত্যা করত ফেরাউন। আমিই গড, আমিই সর্বেসর্বা।
মধ্যরাত পর্যন্ত এই ফরিয়াদ চলল। আমি মহান আল্লাহর কাছে আমাদের মুক্তির প্রার্থনা করছিলাম। জালিমের পতন চাইছিলাম প্রতিটি উচ্চারণে।
২.
পরদিন সকালটা ছিল এক অস্থির প্রত্যাশায় ভরা। ক্লান্তি, অবসাদ আর দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। দুপুরের দিকে মোবাইল ফোনে যখন ঢাকা থেকে আমার সাংবাদিক বড় ভাইয়ের ফোনটা এল, তখন পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ব্যাক করলাম কল, তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “টিভির স্ক্রিন দেখ, ঘটনা ঘটে গেছে। হাসিনা পালিয়ে গেছে। আমরা গণভবনের দিকে যাচ্ছি, লাখে লাখে মানুষ।”
মুহূর্তের মধ্যে সব অবসাদ কেটে গেল। আমি হতচকিত, বাকরুদ্ধ। স্ত্রীকে ডাক দিলাম, সে-ও খবরটা শুনে আমার মতোই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। আমরা দুজনেই বুঝতে পারলাম, ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে। আর দেরি করা যায় না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
মোটরবাইক স্টার্ট দিলাম। গন্তব্য যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র, রাজপথ। রাস্তায় তখন মানুষের ঢল। প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে এক অদ্ভুত দ্যুতিএকই সাথে অশ্রু আর আনন্দ। আমাদের সবারই ইচ্ছা ছিল পতাকা হাতে নেওয়ার। কিন্তু দোকানে গিয়ে দেখি সব শেষ। শেষে একটা দোকানে কিছু পতাকা পেলাম, যদিও দাম বেশি ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তের উচ্ছ্বাসের কাছে টাকা তো তুচ্ছ! একটা বড় পতাকা স্ত্রী মাথায় জড়াল, আর আমি বাইকের সামনে উড়িয়ে দিলাম আমাদের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা।
চাঁচড়া চেকপোস্টের দিকে যখন ছুটছিলাম, মনে হচ্ছিল আমরা কেবল বাইক চালাচ্ছি না, আমরা বিজয়ের ডানা মেলে উড়ছি। লাখো জনতা, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস! মানুষের চোখে এত আনন্দ, এত তৃপ্তি-আমি আমার পুরো জীবনেও কখনো দেখিনি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেখেছি গণঅভ্যুত্থান, কিন্তু এই আগস্টের বিপ্লব ছিল অন্যরকম। এটা ছিল সরাসরি মানুষের হৃদয়ের জয়।
যশোরের প্রতিটি মোড়, দড়াটানা, সবখানেই মানুষের পদচারণা। স্বৈরাচারী শাসকদের আস্তানাগুলো তখন জনশূন্য। মানুষের তেজ আর ক্ষোভ মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল নির্মল আনন্দে। আমরা যারা লেখক, যারা দশকের পর দশক শব্দ নিয়ে কারুকাজ করেছি, সেদিন আমরা বুঝেছিলাম, শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হলো মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ। আমরা যশোরের রাজপথে ভেসে যাচ্ছিলাম সেই আনন্দের জোয়ারে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছে, এই খবরটা যেন যশোর শহরের প্রতিটি ইট-পাথরকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছিল। আমি আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার চোখের কোণে আনন্দাশ্রু। আমাদের এই বিজয়, আমাদের এই মুক্তি, সবটাই মনে হচ্ছিল এক অলৌকিক প্রাপ্তি।
৩.
বিপ্লবের আনন্দ কেবল মুহূর্তের নয়, এটি ইতিহাসের এক বড় শিক্ষা। আমি সেদিন রাতে যখন আবার আমার কবিতার খাতাটা খুলে বসলাম, তখন মনে হচ্ছিল ছাত্ররা আমাদের যে স্বাধীনতা উপহার দিয়ে গেল, তার ভার অনেক। আমি শেষ তিনটি পংক্তি লিখেছিলাম যা আজ চিরন্তন সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে:
ছাত্রদের খুনীরা এই আপ্তবাক্য শোন, প্রমত্ত পদ্মা নীলনদ হয়ে তোমাকে ডাকছে, ডাকছে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, বাংলার অজস্র খরস্রোতা নদী।
এই নদীগুলো কেবল জলধারা নয়, এগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। এই বাংলার মাটি রক্ত দিয়ে লেখা এক দলিল। আজকের এই নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন অতীত দেখি, তখন উপলব্ধি করি, আমাদের কবিদের, লেখকদের দায়বদ্ধতা কতটা বেড়েছে। জালিমদের পতন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জালিমী মানসিকতা দূর করা এখন আমাদের মূল কাজ।
আমি নব্বই দশক থেকে কবিতাকে বন্ধু বানিয়েছি, কিন্তু ৫ আগস্টের মতো আবেগ আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। সেদিন যশোর শহরে মানুষ যখন মিছিলে অংশ নিচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমরা সবাই যেন একটা নতুন পৃথিবীর পথে হাঁটছি। যে ভয় বছরের পর বছর আমাদের কণ্ঠ চেপে রেখেছিল, তা যেন নিমিষেই ধুয়ে মুছে গেল।
বিপ্লব কেবল ভাঙচুর নয়, বিপ্লব হলো নির্মাণ। আমরা এই যে নতুন করে স্বাধীন হলাম, এখন আমাদের দায়িত্ব হলো এই চেতনাকে টিকিয়ে রাখা। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে পথ দেখিয়েছে, সেই পথে যেন আমরা অবিচল থাকতে পারি। আমি কবি হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আজও যখন সেই স্মৃতিচারণ করি, আমার গায়ে কাঁটা দেয়। ৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির জেগে ওঠার দিন। যশোরের রাজপথে সেই যে আনন্দের জোয়ারে ভেসেছিলাম, সেই জোয়ার যেন বাংলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল প্রবহমান থাকে।
৪.
বিজয় অর্জিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিজয়ের স্থায়িত্ব নির্ভর করে আমরা কীভাবে আগামীর পথ রচনা করি তার ওপর। ফ্যাসিবাদ কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতির অবসান দাবি করে। এই স্বৈরাচারী কাঠামো এবং যারা এর দোসর ছিল, তাদের বিচার প্রক্রিয়া হওয়া চাই স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ। আবেগপ্রসূত বিচার নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে বিপ্লবের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা। সরকারকে অবশ্যই এমন এক বিচারিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে ন্যায়বিচার কেবল দৃশ্যমান হবে না, বরং তা সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করবে। বিগত দেড় দশকে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভাঙতে হবে কঠোর হাতে।
ফ্যাসিবাদ যাতে আর কখনো প্রত্যাবর্তন করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর আমূল সংস্কার জরুরি। প্রথমত, প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগকে দলীয় দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি স্বাধীন ও পেশাদার করতে হবে। মেধার মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া রাষ্ট্র কখনো স্থিতিশীল হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম যে অসাধ্য সাধন করেছে, তাদের চেতনাকে আমাদের পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমরা যেন আবার সেই স্তাবকতা আর তোষামোদের যুগে ফিরে না যাই। তৃতীয়ত, সরকারকে সবসময় সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে হবে। গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়, গণতন্ত্র মানে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সমালোচনা করার অধিকার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ফেরাউনের দম্ভ চূর্ণ হয়েছিল সামান্য মশার আঘাতে। ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের বলছে, ক্ষমতার দম্ভ চিরস্থায়ী নয়। আমাদের এই নতুন স্বাধীনতা যেন কেবল কাগজের পাতায় না থাকে, তা যেন প্রতিটি মানুষের অধিকার, সম্মান আর ন্যায়বিচারের দাবিতে সচল থাকে। আমি আমার কবিতার ভাষায় আবার উচ্চারণ করি- নীল নদ হয়ে নদীর ডাক যেন আমাদের সচেতন রাখে, যাতে আমরা আর কখনো শৃঙ্খলিত না হই। এই বিজয়, এই আনন্দ, আর এই স্মৃতি, সব মিলিয়েই তো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। আসুন, আমরা এমন এক দেশ গড়ে তুলি যেখানে আর কোনো রক্তস্রোত আমাদের নদীগুলোকে লাল করে দেবে না, যেখানে কেবল সত্য আর ন্যায়ের সুরই ধ্বনিত হবে রাজপথজুড়ে।
লেখক: ধ্রুন নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক