Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যশোরের সাম্প্রতিক বইমেলার ইতিকথা

মানবেন্দ্র সাহা মানবেন্দ্র সাহা
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৯ মে,২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
যশোরের সাম্প্রতিক বইমেলার ইতিকথা

ইমেলা মানেই লেখক-পাঠকের মিলনমেলা। মানববোধ বিকাশের অনন্য সম্ভার। জানা-অজানার প্রেমে এক নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক, সভ্যতার এক অকৃত্রিম অংশ। বিশ্বের বহু দেশেই বইমেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আনন্দঘন পরিবেশ। এই সরব মানব-উপস্থিতির কল্যাণেই সমৃদ্ধ স্মৃতির খাতায় যোগ হয় কিছু মুহূর্তের ভালো লাগা কিংবা বইয়ের প্রতি আকর্ষণীয়তার প্রবল প্রেম, যা ক্রমাগত পাঠক ও লেখককে অনুপ্রাণিত করে।

সভ্যতার সবচেয়ে সুন্দরতম মেলবন্ধন হলো পাঠাভ্যাস কিংবা বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব। চিরাচরিত এই আয়োজন পৃথিবীর যে দেশেই হোক, যে শহরেই হোক কিংবা যে গ্রামেই হোক—তা শুধু সৌন্দর্যের সাক্ষ্যই রাখে না, তার সঙ্গে বদলে দেয় মানবসভ্যতার অসঙ্গতিপূর্ণ দিকগুলোকেও। কাজেই, যেখানেই বইমেলার আয়োজন হোক না কেন, পাঠক ও লেখক শব্দের মুহুর্মুহু ঝংকার, বাক্যের শরীর, অনুপ্রাস, নন্দনতত্ত্ব, চিত্রকল্প, স্তবক ও চিন্তার গভীরতাকে অনুভব করার জন্যই বইমেলায় আসেন।

বইমেলায় এলে যে আনন্দঘন প্রাণের উচ্ছলতা জেগে ওঠে, তার ক্ষুধায় মেতে ওঠেন লেখক ও পাঠক। সেখানে তৃষ্ণা জাগে শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্কের ভেতরে। হীরকের কৌণিক ঝিলিকের মতো পাঠকের মনে, লেখকের মনে সদালাপী ভঙ্গিতে পরিশুদ্ধ হয় মানুষের মনের সারমর্ম।

এমনই চিরন্তন সত্যের ভেতরে বই-উৎসব আসুক সুস্থ সমাজ-পরিবর্তনের সংকল্প নিয়ে। আমরাও মেতে উঠি দায়বোধপূর্ণ একটি সুন্দর বইমেলার আনন্দে।

কিন্তু যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি বইমেলা ২০২৬—জেলা প্রশাসন, যশোরের উদ্যোগে আয়োজিত এই বইমেলাকে ঘিরে যে উদ্যম থাকার কথা ছিল, তা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। তিন দিনের বইমেলা এত তড়িঘড়ি করে আয়োজন কতটুকু সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত ছিল। প্রশ্নটি নিয়ে ভাবার বিকল্প ছিল কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

তবে দীর্ঘদিন পর বইমেলা হওয়াটাই একটি বড় সফলতা। কিন্তু ১০-১২টি স্টল দিয়ে, ছামিয়ানা টানিয়ে, কয়েকটি ফ্যান ঘুরিয়ে এটিকে বইমেলা বলে চালিয়ে দেওয়াটা কতটুকু সফল—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এত স্বল্প পরিসরে অন্তত যশোরে বইমেলার আয়োজন করা উচিত হয়েছে কি না, সেটিও ভাবার বিষয়।

যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি বইমেলা ২০২৬-এর আয়োজকদের উদ্দেশে বলতে চাই, বইমেলা পরিচালনার দায় এড়িয়ে চলা লেখকদের মনে তীব্র প্রভাব ফেলেছে। এই অবহেলা থেকে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বইমেলা হয়েছে বটে, কিন্তু সত্যিকারের সফলতার আয়োজন যেন অসম্পূর্ণই থেকে গেছে।

বইমেলা পরিচালনা কমিটি কাদের পরিচালনায় মেলাটিকে সফল ও সার্থক করে তুলবেন, সেটিও ভাবা দরকার ছিল। বইমেলার মূল আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল যশোরের‘লেখককুঞ্জ’। ১০৭ জন লেখক-সাহিত্যিকের বইয়ের সমাহার ছিল তাদের স্টলে। মেলার তিন দিনই আনন্দ উপভোগ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখে অবাক হলাম—প্রথম দিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে বইমেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। উদ্বোধন-পরবর্তী মেলার জাঁকজমকপূর্ণ লেখক-পাঠকের উপস্থিতি প্রাণের সঞ্চার করেছিল বলেই মনে হয়। তারপর দিন সকাল ১১টা ৩০ মিনিট থেকে বইমেলা শুরু হলেও দু-চারজন লেখকের উপস্থিতি ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি বললেই চলে।

বইমেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত লেখকদের সঙ্গে লেখকদের প্রাণবন্ত আড্ডা জমে ওঠার প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু তীব্র দাবদাহ এবং লেখকদের অনুপস্থিতি সেটিতেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

এরপরও ‘লেখক কুঞ্জ’-এর আহ্বায়ক কবি মামুন আজাদের সঙ্গে বইমেলা প্রসঙ্গে আলাপকালে তাঁর হতাশার বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট হয়েছে। মনে হয়েছে, কমিটিতে নাম লেখানোর প্রবণতাই যেন বড় হয়ে উঠেছে; অথচ কাজের বেলায় সবকিছুর দায় কীভাবে এড়ানো যায়, সে চেষ্টাই পরিলক্ষিত। সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে মেলা শুরু হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।

তবে বিষয়টি শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। মেলা আয়োজক কমিটির অবহেলাও বেশ আশাহত করেছে। তাঁদের দায়িত্বের কতটুকু তাঁরা পালন করেছেন, সে ব্যাপারেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন ছিল।

তবু আশার ইঙ্গিতও মিলেছে। দাবদাহ কিছুটা শিথিল হলেই কবি-সাহিত্যিক ও পাঠকদের পদচারণায় মেলা সরব হয়ে উঠেছে। এটিকে বইমেলার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন সফলতা বলতেই হবে।

এছাড়াও আরও একটি বিষয় মেলাকে প্রাণ দিয়েছে। সেটি হলো আয়োজকদের সচেতনতায় প্রতিদিনের স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। এসব আয়োজন বইমেলায় আগত দর্শক, পাঠক ও লেখকদের মাঝে এক প্রাণময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আবহও যে একটি বইমেলাকে পরিপূর্ণতা দেয়, এই আয়োজন তারই প্রমাণ বহন করেছে।

একই সঙ্গে এটাও বলতে হয়, বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে যে বইয়ের সম্ভার থাকার কথা ছিল, তা পুরোপুরি দেখা না গেলেও তাঁদের চেষ্টার কমতি ছিল না। দেশ-বিদেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের বইয়ের অনন্য সমাহারও এখানে পরিলক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি যশোরের বিভিন্ন লেখক-সাহিত্যিকদের বইও দৃষ্টি কেড়েছে। আমার দেখা যশোরের লেখক সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ছিল— হরিণ উৎসব, অন্ধ প্রমিথিউস, অমর সাইকেল, প্রথম আগুন, অথচ পাখিরা ডানা মেলে দেয়, অসমাপ্ত চুম্বন, আনারকলি ও মোগল হারামের কবিগণ, কোথায় যাব, এবং বাঙালির ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার সংকট। বইগুলো পাঠের তাগিদ ও মুগ্ধতার আবহ বহন করেছে।

আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল—জাসাসের বইয়ের স্টল। জাসাস সম্পর্কে আমার পূর্বে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কবি ও গবেষক কাজী শওকত শাহির কাছ থেকে জেনেছি, জাসাস বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠন, যেখানে সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। তাদের স্টলে ইতিহাসসমৃদ্ধ আকর্ষণীয় বইয়ের উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছে।

পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই—বইমেলাকে কেন্দ্র করে যশোরে যে আনন্দঘন বার্তা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই আমাদের প্রেরণার অংশ এবং এক ধরনের সফলতার সূচনা। আগামীতে আমরা আশা করব, এত তড়িঘড়ি ও স্বল্প পরিসরে নয়, বরং আরও সুপরিকল্পিত ও বৃহৎ পরিসরে যশোরে একটি আন্তর্জাতিক মানের বইমেলার আয়োজন করা হবে।

আয়োজক কমিটির কাছে এই প্রত্যাশা।

লেখক: কবি

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)