ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে তথাকথিত 'ঐতিহাসিক শান্তি উদ্যোগ' হিসেবে পরিচিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’ (Abraham Accords) আসলে ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণ করে ইসরায়েলের অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি একপাক্ষিক রাজনৈতিক হাতিয়ার। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এবং বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই চুক্তিকে নতুন করে সম্প্রসারণের উদ্যোগ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক 'ডন' (Dawn)-এর সাম্প্রতিক এক সম্পাদকীয়তে এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক, অদূরদর্শী এবং ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে একটি চরম 'অসৎ আচরণ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আব্রাহাম চুক্তি কী
এটি হলো বহুলালোচিত কূটনৈতিক সমঝোতা। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং বাহরাইনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে এই চুক্তিতে উত্তর আফ্রিকার দেশ সুদান এবং মরক্কোও যোগ দেয়। ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম—এই তিন প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মের সাধারণ পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম (আ.) (হিব্রু ভাষায় 'আব্রাহাম')-এর নামানুসারে এই চুক্তির নামকরণ করা হয় ‘আব্রাহাম চুক্তি’। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থান বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন যুগের সূচনা করা। এটি ছিল ১৯৯৪ সালে ইসরায়েল-জর্ডান শান্তি চুক্তির পর কোনো আরব রাষ্ট্রের সাথে ইসরায়েলের প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগ।
এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ছিল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা। আব্রাহাম চুক্তির ফলে স্বাক্ষরকারী আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এর পর থেকে দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ, পর্যটন, মুক্ত বাণিজ্য এবং যৌথ বিনিয়োগের এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, পানি ব্যবস্থাপনা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তির আদান-প্রদান।
আব্রাহাম চুক্তি: শান্তি নাকি রাজনৈতিক কৌশল?
আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মধ্যস্থতাকৃত আব্রাহাম চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিন সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান না করেই আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। সম্প্রতি ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন প্রশাসন আরও বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে এই চুক্তিতে ভেড়াতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কট্টরপন্থী ইসরায়েলপন্থী লবি এবং মার্কিন ডানপন্থীদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই বেশি চালিত। ইরান সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে আব্রাহাম চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং মূল সংকট থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরানোর একটি অপকৌশল মাত্র।
ইরান সংকট বনাম মূল ফিলিস্তিন প্রশ্ন
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার গভীরে রয়েছে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামরিক শক্তির মহড়া। কিন্তু এই উত্তেজনা কোনোভাবেই সেই মৌলিক সত্যটিকে মুছে দিতে পারে না, যা বিগত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আর তা হলো—ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার হরণ এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি।
অভিযোগ উঠেছে যে, ওয়াশিংটনের এই সাম্প্রতিক উদ্যোগটি মূলত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে চায়, যেখানে মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলকে মেনে নেবে, অথচ ফিলিস্তিনিরা অবর্ণনীয় দখলদারিত্বের মধ্যেই জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে। এই চরম বৈষম্যের কারণেই বিশ্বের বহু মুসলিম প্রধান দেশ আজ পর্যন্ত এই চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় ও অবিশ্বাস প্রকাশ করে আসছে।
পাকিস্তানের অনড় ও বাস্তবসম্মত অবস্থান
এই জটিল প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট এবং আপসহীন। ইসলামাবাদ দীর্ঘ বছর ধরে একই নীতি বজায় রেখেছে-
ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি ন্যায্য নিষ্পত্তি এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
পাকিস্তানের এই নীতিকে কোনোভাবেই 'চরমপন্থা' হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক স্বীকৃতি যে, লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ ও বৈধ দাবিকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি বা স্থিতিশীলতা আসতে পারে না।
ইসরায়েলের একগুঁয়েমি ও গাজার মানবিক বিপর্যয়
শান্তি চুক্তির নানা আয়োজন চললেও বাস্তবে ইসরায়েল কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে এগোতে ন্যূনতম আগ্রহ দেখায়নি। উল্টো অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান, নির্বিচার বোমাবর্ষণ এবং কঠোর অবরোধের ফলে গাজা আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।
এমন একটি সময়ে, যেখানে ইসরায়েলের কোনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না কিংবা রাজনৈতিক সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না, সেখানে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা করা কেবল অনৈতিকই নয়, বরং অবাস্তবও বটে।
জনমতের শক্তি বনাম কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা
ওয়াশিংটন এবং তার মিত্ররা মুসলিম বিশ্বের জনমতের গভীরতা উপলব্ধি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর সরকারগুলো হয়তো তাদের নিজস্ব কৌশলগত বা অর্থনৈতিক কারণে মার্কিন কূটনীতিতে সাময়িকভাবে সাড়া দিতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচারের দাবিকেই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখে।
জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিকে অবজ্ঞা করে যদি কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়াও হয়, তবে তার কোনো টেকসই বৈধতা থাকবে না। করমর্দন কিংবা জমকালো কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের পাতায় শিরোনাম তৈরি করা সহজ, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র পাওয়ার অধিকার হরণ করে নেওয়া কোনো চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই প্রকৃত স্থিতিশীলতা ও শান্তি আনা সম্ভব নয়।
ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ: ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক