বোশেখ আসে
বিদায় নিল ফুলকলিরা
মুখ লুকালো মৌ-অলিরা,
চারদিকেতে শুধুই খরা
তপ্ত হাওয়া আগুন ঝরা।
তাপ-দগ্ধ ধরা, তল
চাতক যাঁচে ফটিক জল।
মাথায় নিয়ে জটার বোঝা
কালবোশেখী আসে সোজা,
মেঘ-বিজলী সঙ্গে জোটে
লক্ষ কামান গোলা ছোটে।
অস্ত্রে অস্ত্রে ঝন্ ঝনানি
চমকে ওঠে বন-বনানী।
তীরের বেগে বৃষ্টি পড়া।
যুদ্ধ শেষে শান্ত ধরা
ভিজে মাটি গন্ধ ছড়ায়
সোঁদা গন্ধে মাতাল করায়।
এমনি ভাবে বছর শুরু
সকল মাসের ঋদ্ধ গুরু
বোশেখ আসে উড়িয়ে কেতন,
জাগিয়ে দিতে সুপ্ত চেতন।
আবাহন বৈশাখে
চৌর্যবৃত্তি করে দুর্ব্বাশার রোষ
অগ্নি-তুরগ ছুটিয়ে রুদ্র তেজে আসে বৈশাখ।
কালিদাসের মেঘদূত হয় ফেরারী
নরম মাটির বুকে জাগে, পাষাণের রুক্ষতা,
ফসলের ভ্রূণ মাথা কোটে মৃত্তিকার শুষ্ক গর্ভে,
আকাশের নিচে মাঠে, ঘাটে বহ্নিমান চিতা,
চারিদিকে চলে খাণ্ডব দাহন
চাতকের কণ্ঠে আকুলআর্তি, ‘ফটিক জল।’
শিরে শঙ্করের জড়িয়ে জটা
বায়ুকোণ চিরে আসে কালবৈশাখী,
মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে লণ্ডভণ্ড হয়
আর এক দক্ষের মহাযজ্ঞ।
তারপর পড়ে থাকে বিপর্যস্ত জনপদ, অরণ্য প্রকৃতি।
করুণা, কোমলতা, জীর্ণতার স্থান নেই বৈশাখে
তবুও করতে বরণ উন্মুখ
দুর্ব্বাশা বৈশাখেরে বাঙালী-হৃদয়।
আসে বৈশাখ নতুনের কেতন উড়িয়ে
জাগিয়ে দিতে সুপ্ত চেতনা।
তাই কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়
বৈশাখের আবাহন মন্ত্র,
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...।’
সব ছিল
গোলা ভরা ধান ছিল,
বরজ জুড়ে পান ছিল,
পুকুর ভরা মাছ ছিল
ফল ফলারির গাছ ছিল
আর যে ছিল গোয়াল ভরা গরু।
জ্ঞানী গুণীর মান ছিল,
কন্ঠ ভরা গান ছিল,
ঘরে ঘরে সুখ ছিল
সবার হাসি মুখ ছিল,
ধান কাউনের মাঠ ছিল
শান বাধাঁনো ঘাট ছিল।
দেশটা ছিল কল্পতরু।
হারিয়ে গেল বনের মায়া
নেইকো যে আর সবুজ ছায়া,
বছর বছর শুধুই খরা,
নদীর বুকে ধু ধু চরা
সবশুকিয়ে দেশটা প্রায় মরু।