নজরুল ইসলাম
ঈদ হলো প্রিয়জনদের সাথে অর্থপূর্ণ উপায়ে সংযুক্ত হওয়ার সময়, কেবল তালিকার নামের পাশে টিক চিহ্ন দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। তবুও আমাদের ইনবক্সগুলো সেই একই ছাঁচে ঢালা কপি-পেস্টের যান্ত্রিক ঈদের শুভেচ্ছাবার্তায় সয়লাব হয়ে যাচ্ছে।
ঈদ। আনন্দের সময়, উদযাপনের সময় এবং সেই সাথে সাধারণ বা জেনেরিক শুভেচ্ছাবার্তার এমন এক সুনামির সময় যা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে—আমি বোধহয় গত ঈদে ফিরে গেছি। কারণ সব বার্তাই হুবহু এক। প্রতিবার যখনই আমি কোনো একটি বার্তার দিকে তাকাই, মনে হয় এটি আগে কোথাও দেখেছি। আর এই ‘দেজা ভ্যু’ (পুরানো কোনো ঘটনা নতুন করে ঘটার অনুভূতি) কেবল আমার একার নয়।
মানুষ বছরের পর বছর, ঈদের পর ঈদ একই বার্তা পাঠাতে থাকে। প্রায় প্রতিটি বার্তাই এমন— 'আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে ঈদ মোবারক' অথবা 'এক্সওয়াইজেড লিমিটেডের পক্ষ থেকে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে জানাই পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা'।
এমন মামুলি শব্দগুলো আমাদের অনেকের কাছেই তার আবেদন হারিয়েছে, আর হারানোই স্বাভাবিক। কারণ এগুলো বিগত বছরের কপি-পেস্ট করা কিছু শব্দ মাত্র, যাতে প্রেরকের কোনো আবেগ মিশে থাকে না।
আমি খুব কমই এমন বার্তা পড়ি, উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা। এই ধরনের বার্তা পাওয়া মাত্রই আমার ফোনটি জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করে। আর সত্যি বলতে, ব্যক্তিগত স্পর্শ না থাকলে আমরা কি আসলে কেউ এই শুভেচ্ছাবার্তাগুলোর উত্তর দিই? সম্ভবত না।
এখন, আমাকে ভুল বুঝবেন না। ঈদে শুভেচ্ছা পেতে আমি পছন্দই করি। এটি নতুন পোশাক পরার উত্তেজনা, সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়া সুস্বাদু খাবারের জিভে জল আনা ঘ্রাণ এবং পরিবার ও বন্ধুদের আড্ডার হাসির মতোই আনন্দদায়ক। মানুষের মধ্যে ভালোবাসা এবং শুভকামনা ভাগ করে নেওয়া নতুন পোশাক কেনা বা বন্ধুদের সাথে দেখা করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যা হলো, অন্যান্য সব কার্যক্রম যেখানে আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ, সেখানে গৎবাঁধা এই সব মেসেজের তোড়জোড় রাস্তার গাড়ি গণনার মতোই একঘেয়ে। এগুলোতে সেই স্ফুলিঙ্গ, সেই ব্যক্তিগত ছোঁয়া, অথবা ফরাসিরা যাকে বলে "je ne sais quoi" (এমন কিছু যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না কিন্তু বিশেষ অনুভূতি দেয়)—তার অভাব স্পষ্ট।
পাঠকের কাছে এগুলো পড়া একটি বাড়তি ঝক্কি ছাড়া আর কিছু নয়—একটি বিরক্তিকর এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচার যা দ্রুতই যন্ত্রণায় রূপ নেয়। আর যখন এটি আমাদের কাছ থেকে কোনো উত্তরের প্রত্যাশা করে, তখন সেই উত্তরটিও হয় ঠিক ততটাই প্রাণহীন এবং গৎবাঁধা।
আর এটি কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও সমানভাবে দোষী। কোম্পানিগুলো প্রায়ই তাদের গ্রাহকদের সাথে যুক্ত হওয়ার আশায় ঢালাওভাবে তৈরি করা ঈদের শুভেচ্ছা পাঠায়, কিন্তু এই বার্তাগুলো কোনো স্ক্রিপ্টেড টেলি মার্কেটিং পিচের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত কিছু নয়।
গ্রাহকদের মন জয় করার পরিবর্তে, তারা বরং বিরক্তি এবং আন্তরিকতাহীনতার ঝুঁকিই বাড়িয়ে তোলে। একই রকম রোবোটিক উল্লাসে আমাদের ইনবক্স ভরিয়ে দেওয়া এই কর্পোরেট বার্তাগুলো অনেক সময় আন্তরিক শুভেচ্ছার চেয়ে স্প্যাম (Spam) বলেই বেশি মনে হয়।
সত্যি বলতে, এটি এক প্রকার হয়রানির কাছাকাছি। কল্পনা করুন, আপনি সামনের উৎসবের দিনগুলো নিয়ে ভাবছেন, আর ঠিক তখনই আপনার ফোনটি সেই একই একঘেয়ে শুভেচ্ছাবার্তায় বারবার বেজে উঠছে: "ঈদ মোবারক! এই ঈদ আপনার এবং আপনার পরিবারের জন্য আনন্দ ও সুখ বয়ে আনুক।" ওই তো, আবারও সেই একই কথা!
একটি গৎবাঁধা বা জেনেরিক ঈদের শুভেচ্ছা কোনোভাবেই ঈদের মেজাজের সাথে খাপ খায় না! আমাদের জন্য ঈদ হলো সবচেয়ে বড় উৎসব যেখানে আমরা নিজেদের ভালোবাসার পাত্র এবং নিরাপদ মনে করি। একটি ব্যক্তিগত এবং অনন্য ঈদের বার্তা আমাদের কাছে এক বাটি চমৎকার সেমাই পাঠানোর মতোই তৃপ্তিদায়ক।
একবার ভাবুন তো, আপনার কতই না ভালো লাগত যদি কেউ আপনার কথা ভাবার জন্য কিছুটা সময় নিত, আপনার সাথে সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু উল্লেখ করত—হতে পারে কোনো ভেতরের কৌতুক (Inside Joke), সাম্প্রতিক কোনো অর্জন, কিংবা কোনো যৌথ স্মৃতি—এবং তারপর ঈদের শুভেচ্ছা জানাত? এটি কতই না সুন্দর হতো! তাহলে কেন আমরা ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার এবং অন্যদের বিশেষ অনুভব করানোর চেষ্টা করি না?
ঈদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চলুন আমরা আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের শুভেচ্ছাবার্তাগুলোকে আরও ব্যক্তিগত এবং হৃদয়স্পর্শী করে তুলি। সর্বোপরি, ঈদ হলো প্রিয়জনদের সাথে অর্থপূর্ণ উপায়ে যুক্ত হওয়ার সময়, কেবল তালিকার নামের পাশে টিক চিহ্ন দেওয়ার কোনো কাজ নয়।
চলুন সবার প্রতি দয়া করি এবং এই রোবোটিক বা যান্ত্রিক শুভেচ্ছা জানানো বর্জন করি। কিছুটা প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করি এবং আমাদের শুভকামনাগুলোকে অর্থবহ করে তুলি। দিনশেষে, ঈদের উদ্দেশ্যই হলো সুখ ভাগ করে নেওয়া, আর এর জন্য একটি হৃদয়স্পর্শী বার্তার চেয়ে কার্যকর আর কিছুই নেই। মনে রাখবেন, আপনার শুভেচ্ছা যদি ব্যক্তিগত না হয়, তবে আপনি হয়তো কোনো উত্তরও পাবেন না—তাই কেন এটিকে স্মরণীয় করে তুলছেন না?