ধ্রুব ফিচার
পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের টেবিলে ভাজাপোড়া খাবার এ দেশের এক চিরাচরিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজু ও বেগুনি ছাড়া বাঙালির ইফতার যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তবে স্বাস্থ্যগত বিচারে এই দুটি খাবারের কোনোটিকেই 'বেশি ভালো' বলার সুযোগ নেই। পেঁয়াজু তৈরি হয় ডাল দিয়ে, যা উদ্ভিজ্জ বা দ্বিতীয় শ্রেণির আমিষের উৎস। অন্যদিকে, বেগুনির মূল উপাদান বেগুন পুষ্টিকর হলেও তেলে ভাজার সময় এর অধিকাংশ গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায় এবং কেবল বাইরের বেসনের আবরণ থেকে সামান্য আমিষ পাওয়া যায়। পুষ্টিগুণ বিচারে বেগুনির চেয়ে পেঁয়াজুতে আমিষের পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকলেও দুটি খাবারই উচ্চ ক্যালরি এবং ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট সমৃদ্ধ, যা হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত মানুষ বেগুনি একটি বা দুটি খেলেও পেঁয়াজু খাওয়ার পরিমাণ থাকে বেশি, ফলে শরীরে ক্ষতিকর চর্বি ও ক্যালরি জমার আশঙ্কা বাড়ে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খেলে অ্যাসিডিটি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগে আক্রান্তদের জন্য এই দুটি পদই এড়িয়ে চলা জরুরি। একান্তই খেতে চাইলে যেকোনো একটি পদ খুব সামান্য পরিমাণে মুড়ি, শসা ও টমেটো দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
সুস্থ থাকতে ইফতারের শুরুটা হওয়া উচিত সহজে হজমযোগ্য ও শীতল শর্করা দিয়ে। খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙা সবথেকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, কারণ খেজুরের পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। এরপর মূল খাবার হিসেবে দই, লাল চিড়া, কলা ও বাদামের সংমিশ্রণ হতে পারে একটি আদর্শ ইফতারি। দই একটি প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক যা পেট ঠান্ডা রাখে এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে লাল চিড়া বেছে নিলে এতে থাকা আঁশ রক্তের শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে। এছাড়া ফলের জুস বা স্মুদির মতো তরল খাবার শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে। মাগরিবের নামাজের পর প্রোটিন ও শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় হালিম বা সবজি-মুরগির স্যুপ একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে। তবে মুড়ির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অত্যন্ত বেশি হওয়ায় তা পরিমিত পরিমাণে এবং প্রচুর সালাদ ও প্রোটিনের সমন্বয়ে খাওয়া উচিত।
সাহ্রির খাবার হওয়া চাই আরও বেশি পরিকল্পিত, কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই সারা দিনের কর্মশক্তি অটুট থাকে। সাহ্রিতে জটিল শর্করা যেমন লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি রাখা জরুরি, যা ধীরে ধীরে হজম হয়ে রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ করে। এর সঙ্গে মাছ, মুরগির মাংস বা ডিমের মতো প্রোটিন এবং লাউ, পেঁপে বা ঝিঙার মতো মাঝারি আঁশের সবজি রাখা স্বাস্থ্যসম্মত। সাহ্রিতে অন্তত দু-একটি খেজুর ও এক গ্লাস দুধ পান করলে সারা দিন সতেজ থাকা যায়। তবে একটি সাধারণ ভুল হলো তৃষ্ণা মেটানোর তাড়নায় শেষ মুহূর্তে ঢকঢক করে অতিরিক্ত পানি পান করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একবারে অতিরিক্ত পানি পাকস্থলীর এনজাইম পাতলা করে হজমে বিঘ্ন ঘটায়। এর বদলে ইফতার থেকে সাহ্রি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত। সাহ্রির সময় চা, কফি বা অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার বর্জন করা প্রয়োজন, কারণ এগুলো শরীরকে দ্রুত পানিশূন্য করে ফেলে এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। পরিমিতি বজায় রেখে সুষম খাবার গ্রহণ এবং সঠিক পদ্ধতিতে পানি পানের এই সুশৃঙ্খল অভ্যাসই আপনাকে দীর্ঘ রমজানে সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করবে।