Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ফেলে দেওয়া চুল থেকে যেভাবে তৈরি হয় পরচুলা

ধ্রুব ফিচার ডেস্ক ধ্রুব ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৭:৪৬ এ এম
আপডেট : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০৮ এ এম
ফেলে দেওয়া চুল থেকে যেভাবে তৈরি হয় পরচুলা

পরচুলা তৈরি করছে নারীরা ছবি: সংগৃহীত

একসময় যা ছিল গৃহস্থালির ফেলনা আবর্জনা, ডাস্টবিন কিংবা ড্রেনের অনাকাঙ্ক্ষিত বর্জ্য, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সেই ফেলে দেওয়া মানুষের চুলই এখন রূপ নিয়েছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদে। গ্রামের শত শত নারীর হাতে তৈরি এই চুলই আজ অবলীলায় পরিশোধ করছে লাখ লাখ টাকার ঋণের বোঝা, টেনে তুলছে অসুস্থ স্বামীর সংসারের চাকা, আর হাজারো অনটনগ্রস্ত পরিবারকে দেখাচ্ছে এক নতুন আলোর পথ। মানুষের বর্জন করা ছাঁটাই চুল দিয়েই ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পোড়াবাড়িয়া গ্রামের নারীরা প্রতিদিন বুনন করে চলছেন নিজেদের ভাগ্যের এক নতুন গল্প। গৃহবধূ শিরিন আক্তারের মতো গ্রামীণ শত শত নারী আজ ফেলে দেওয়া চুল ধোয়া-মোছা, রোদে শুকানো এবং সূক্ষ্ম 'নটিং' বা গিঁট দেওয়ার মতো শৈল্পিক দক্ষতা রপ্ত করে বিশ্বমানের পরচুলা তৈরি করছেন। আর তাঁদের হাত ধরে তৈরি করা এসব পরচুলা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিক্রি হয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

এই একটি উদ্যোগ কীভাবে একটি পুরো জনপদের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ পোড়াবাড়িয়া ও তার আশপাশের এলাকাগুলো। পোড়াবাড়িয়া ছাড়িয়ে গফরগাঁওয়ের ঘাগড়া, উথুরী, বাসুতিয়া, মশাখালীসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের হাজার হাজার নারী এখন সরাসরি এই পরচুলা শিল্পে যুক্ত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিদিন সকালে কিংবা কাজের সময় দূর-দূরান্তের এই নারী শ্রমিকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে যাতায়াত করতে পারেন, সেজন্য কারখানা মালিকেরা নিজস্ব পিকআপের মাধ্যমে বিনামূল্যে যাতায়াতের সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। ফলে যাতায়াত নিয়ে বাড়তি কোনো চিন্তা বা বাড়তি খরচ না করেই নারীরা প্রতিদিন কারখানায় এসে তাঁদের নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন।

কারখানায় কাজ শুরু করার পর থেকে স্থানীয় নারীদের জীবনযাত্রার মান এবং চিন্তাভাবনায় এসেছে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। সাথী আক্তার নামের এক স্থানীয় নারী জানান, তিনি আগে পুরোপুরি সংসারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন পরচুলা কারখানায় কাজ করে তিনি প্রতি মাসে নিয়মিত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা উপার্জন করছেন। এই উপার্জনের টাকা দিয়ে তিনি কেবল পরিবারে সচ্ছলতাই আনেননি, বরং নিজের আয়ের টাকায় বাড়িতে সুপেয় পানির জন্য নলকূপের মোটর বসিয়েছেন এবং পরিবারের সুবিধার জন্য একটি ফ্রিজও কিনেছেন। আবার অন্যদিকে মাফিয়া আক্তারের গল্পটি আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। যখন তিনি নবম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন অভাবের তাড়নায় তাঁকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। কিন্তু কারখানার কাজ তাঁর লেখাপড়ার পথ বন্ধ করেনি। কাজের পাশাপাশি নিজের চেষ্টা ও অদম্য ইচ্ছায় তিনি এসএসসি পাস করেন এবং বর্তমানে দক্ষতা বৃদ্ধির পর প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা আয় করছেন।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার জানান, এই পরচুলা কারখানাটি গ্রাম এলাকার দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এক চমৎকার মডেল তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি শুরুতেই অনভিজ্ঞ নারীদের কাজ শেখায়, তাঁদের কারিগরি দক্ষতা বাড়ায় এবং পরবর্তীতে পারদর্শিতার ওপর ভিত্তি করে কাজের স্থায়ী সুযোগ তৈরি করে দেয়। এমনকি অনেক নারী যাঁদের ছোট শিশু আছে বা কোনো বিশেষ কারণে সারাদিন কারখানায় এসে সময় দিতে পারেন না, তাঁরা সংসারের সমস্ত দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলেও ঘরে বসে অবসরে পরচুলা তৈরির কাজ করতে পারছেন। ফলে নারীরা তাঁদের ঘরের নিরাপত্তা বজায় রেখেও অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারছেন।

চুল কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এবং কীভাবে তা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য হয়ে ওঠে, তার পেছনের প্রক্রিয়াটিও বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। এই শিল্পের মূল কাঁচামাল বা মানুষের কাঁচা চুল সংগ্রহের জন্য একটি নিজস্ব সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নরসুন্দরের সেলুন, বিউটি পার্লার এবং গ্রামগঞ্জের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়ানো ফেরিওয়ালা বা হকারদের কাছ থেকে সংগৃহীত হয় এই ফেলে দেওয়া চুল। হকাররা গ্রামীণ গৃহিণীদের কাছ থেকে চুরি, প্লাস্টিকের সামগ্রী বা সামান্য টাকার বিনিময়ে এই চুলগুলো সংগ্রহ করেন। সংগ্রহের মান, জটা ছাড়ানো অবস্থা এবং দৈঘ্যের ওপর নির্ভর করে প্রতি কেজি কাঁচা চুল হকারদের কাছ থেকে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা দামে কিনে নেওয়া হয়।

কারখানায় চুলগুলো নিয়ে আসার পর শুরু হয় একাধিক সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ। প্রথম ধাপে চুলের দৈর্ঘ্য, মান এবং স্বাভাবিক ধরণ অনুযায়ী সেগুলোকে খুব দক্ষতার সঙ্গে আলাদা বা বাছাই করা হয়। এরপরের ধাপে বিশেষ ক্ষার ও শ্যাম্পু দিয়ে চুলগুলোকে খুব ভালোভাবে ধোয়া হয়, জীবাণুমুক্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে শুকানো হয়। ক্লায়েন্টের পছন্দ বা বৈশ্বিক ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুযায়ী অনেক সময় বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এই চুলে আকর্ষণিয় রং বা ডাইং করা হয়। এভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা বা প্রক্রিয়াজাত চুল প্রতি কেজি ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে মানভেদে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বেচাকেনা হয়ে থাকে।

পরচুলা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় 'নটিং' বা গিঁট দেওয়ার কাজটিতে। এটিকে বলা যায় এই শিল্পের আসল কারিগরি বা শিল্পকর্ম। এই ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা পরিষ্কার চুল থেকে ছোট ছোট কয়েকটি গুচ্ছ হাতে তুলে নিয়ে বিশেষ এক ধরনের মানানসই ক্যাপ বা নেট বেসের সঙ্গে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুচ ও হাতের ছোঁয়ায় এক এক করে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে গিঁট দিয়ে বসানো হয়। পরচুলার আকার, চুলের ঘনত্ব এবং নকশার ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে মাত্র একটি নিখুঁত পরচুলা তৈরি করতে একজন দক্ষ নারী শ্রমিকের টানা ১ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

আজ যে শিল্পটি কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছে, তার পথচলা কিন্তু শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ একটি স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে। ২০০৭ সালে পোড়াবাড়িয়া গ্রামের উদ্যমী তরুণ মো. নুরুজ্জামান দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণের সময় সেখানে একটি পরচুলা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ পান। সেই কারখানার কর্মযজ্ঞ দেখে তিনি নিজ এলাকায় এই শিল্পের সম্ভাবনা অনুভব করেন এবং দেশে ফিরে মাত্র ২০ লাখ টাকা প্রাথমিক মূলধন নিয়ে ‘পিবাড়িয়া গ্রুপ’-এর ব্যানারে প্রথম পরচুলা তৈরির একটি ছোট কারখানা গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট চারাগাছটি আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পিবাড়িয়া গ্রুপের অধীনে পরিচালিত মোট ১৮টি কারখানায় ১,৮৩০ জন শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। আর আনন্দের বিষয় হলো, এই বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশই স্থানীয় গ্রামীণ নারী।

পিবাড়িয়া গ্রুপের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের পরচুলা তৈরির এই কারখানাগুলোতে প্রতি মাসে কাঁচামাল হিসেবে আনুমানিক ১,০০০ কেজি মানুষের প্রক্রিয়াজাত চুল ব্যবহৃত হয়। পণ্যের ধরন, সুতা বা ক্যাপের গুণগত মান এবং আধুনিক নকশার ওপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ পরচুলা তৈরিতে সব মিলিয়ে খরচ হয় ২,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা। তৈরির পর এগুলো যখন বৈশ্বিক বাজারে যায়, তখন বিশ্ববাজারে একেকটি পরচুলা ২২ মার্কিন ডলার (প্রায় ২,৬৪০ টাকা) থেকে শুরু করে মানভেদে ৪০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৮,০০০ টাকা) পর্যন্ত আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হয়। এর ফলে পিবাড়িয়া গ্রুপ বর্তমানে এই একক খাত থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বর্তমানে তাদের উৎপাদিত উচ্চমানের এসব পরচুলা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জার্মানি, ইতালি, জাপানসহ বিশ্বের প্রায় ২২টি উন্নত দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। আর বিশ্ববাজারের এই চাহিদার মধ্যে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

পরচুলার এই নতুন ও সম্ভাবনাময় খাতটি নিয়ে উদ্যোক্তারা অত্যন্ত আশাবাদী। পিবাড়িয়া গ্রুপ কেবল বর্তমান অর্জনেই থেমে থাকতে চায় না; আগামী দিনগুলোতে এই শিল্পের পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজার অসচ্ছল ও সুবিধা বঞ্চিত নারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে তারা সামনে এগোচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে শতভাগ সফল করতে এবং রপ্তানির খাতকে আরও সুসংহত করতে কিছু বাস্তব প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। শিল্পের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কাঁচামাল বা ডাইং কেমিক্যাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা, আন্তর্জাতিক শিপিং বা পরিবহন খরচ কমানো এবং বিশ্বের নতুন নতুন দেশে পণ্যের বাজার প্রসারে সরকারের সমন্বিত নীতিগত ও কূটনৈতিক সহযোগিতা ভীষণ প্রয়োজন। যদি সঠিক সময়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও সময়োপযোগী পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়, তবে ময়মনসিংহের শান্ত গ্রামগুলো থেকে শুরু হওয়া এই ফেলনা চলের পরচুলা শিল্প খুব দ্রুতই পোশাক শিল্পের মতোই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার অন্যতম শীর্ষ ও শক্তিশালী রপ্তানি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)