ক্রীড়া ডেস্ক
জান্নাত ও কবিতা ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকসে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের কঠোর নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নারী অ্যাথলেটিকসে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না দেশের দুই শীর্ষ অ্যাথলেট—বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জান্নাত বেগম এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কবিতা রায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় তাদের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি পুরুষ হরমোনের উপস্থিতি ধরা পড়ায় বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন তাদের নারী বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর আজীবন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সঙ্গে তাদের ক্যারিয়ারের সব অর্জিত পদক ও জাতীয় রেকর্ড বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ড এই দুই অ্যাথলেটের শারীরিক ও লিঙ্গ নির্ধারণী পরীক্ষা শুরু করে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে চলতি বছরের ১১ মে পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং ১৬ মে মেডিক্যাল বোর্ড তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুনির্দিষ্ট মতামত অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কাছে হস্তান্তর করে।
মেডিক্যাল বোর্ডের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৮ বছর বয়সি জান্নাত বেগম এবং ১৯ বছর বয়সি কবিতা রায়—উভয়েই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'ডিফারেন্স অব সেক্স ডেভেলপমেন্ট' বা 'XY DSD' নামক বিরল যৌন বিকাশজনিত বৈচিত্র্যের অধিকারী। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায় তাদের শরীরে পেনোস্ক্রোটাল হাইপোস্পেডিয়াসের উপস্থিতি এবং ইনগুইনাল ক্যানেলে অভ্যন্তরীণ গোনাড (জননগ্রন্থি) শনাক্ত হয়, যা চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী তাদের পুরুষ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করে।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য ধরা পড়ে তাদের রক্তে টেস্টোস্টেরনের (পুরুষ হরমোন) মাত্রা পরিমাপের পর। বিশ্ব অ্যাথলেটিকস সংস্থার (ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস) নিয়ম অনুযায়ী, নারী বিভাগে অংশ নেওয়ার জন্য একজন ক্রীড়াবিদের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা টানা ২৪ মাস ধরে প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ২.৫ ন্যানোমোলের (nmol/L) নিচে থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ল্যাব টেস্টে জান্নাত বেগমের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া যায় ১৯.৬৬ nmol/L—যা নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সীমার চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে কবিতা রায়ের হরমোন মাত্রা পাওয়া যায় ১৬.৫০ nmol/L, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে সাড়ে ৬ গুণেরও বেশি।
হরমোনের এই প্রকাণ্ড তারতম্য এবং মেডিক্যাল বোর্ডের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আজ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির দ্বিতীয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কঠোর এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের স্পষ্ট বিধি অনুসরণ করে তাদের নারী ইভেন্টে অংশগ্রহণে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তাদের বিগত দিনের সব অ্যাথলেটিক অর্জন মুছে ফেলা হয়েছে। জ্যাভলিন থ্রো ও ডিসকাস থ্রোয়ে জান্নাত বেগমের গড়া ২টি নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ মোট ৮টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদক বাতিল করা হয়েছে। অপর দিকে ট্র্যাকের উদীয়মান তারকা কবিতা রায়ের ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে অর্জিত ১টি স্বর্ণ, ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদকও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন জানিয়েছে, বিধি অনুযায়ী এই ইভেন্টগুলোর পদক ও অবস্থান পরবর্তী যোগ্য অ্যাথলেটদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বণ্টন করা হবে।