আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ইরানে ‘কুহ-ই কোলাং’ নামে পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের একটি রহস্যময় ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্গ, যা এতটাই শক্তিশালী আগ্নেয় শিলায় গঠিত যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী GBU-57 ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমাও সেটি ধ্বংস করতে সক্ষম নাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৩ জুলাই এক রেডিও সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন—যুক্তরাষ্ট্রের নজর রয়েছে এই পর্বতের ওপর এবং প্রয়োজনে এটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারি। ইরান প্রস্তুত থাকুক।’
গত বছরের শেষ দিক থেকে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিকেরা সন্দেহ করছেন—স্থানীয়ভাবে ‘কুহ-ই কোলাং’ নামে পরিচিত ওই পর্বতের নিচে একটি নতুন ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে ইরান। সম্প্রতি ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’ এবং ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পর্বতটির ভেতরে থাকা অ্যান্ডেসাইট নামের আগ্নেয় শিলা অত্যন্ত শক্ত। এই শিলা প্রতি বর্গইঞ্চিতে ২১ হাজার থেকে ৪৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত চাপ সহ্য করতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাংকার-বাস্টার বোমা মাঝারি শক্তির শিলার মধ্যে প্রায় ৮ মিটার গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। আবার গবেষকদের ধারণা, পিকঅ্যাক্স পর্বতের নিচে যদি সত্যিই কোনো স্থাপনা তৈরি হয়ে থাকে, তবে সেটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। ফলে বোমাটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই পর্বতের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসও একে বিশেষভাবে সুরক্ষিত করেছে। প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে আরবিয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে জাগরোস পর্বতমালা গঠিত হয়। সেই সময়ের আগ্নেয়গিরির লাভা শীতল হয়ে অ্যান্ডেসাইট শিলার সৃষ্টি করে, যা চুনাপাথরের স্তরের মধ্যে শক্ত আবরণ তৈরি করেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকটোনিকস অধ্যাপক রিচার্ড ওয়াকারের ভাষায়, এটি মূলত একটি সাবডাকশন জোনের ওপর গড়ে ওঠা আগ্নেয় ভূ-গঠন, যার শিলাস্তর অত্যন্ত দৃঢ়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের দিকে ইরান এই পর্বতের নিচে সুড়ঙ্গ খনন শুরু করে। ধারণা করা হয়, নাতাঞ্জে নাশকতায় ক্ষতিগ্রস্ত সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কেন্দ্রের বিকল্প হিসেবেই এই স্থাপনাটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমি মনে করেন, ভবিষ্যতে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও সম্ভাব্য অস্ত্র-সম্পর্কিত কার্যক্রম অত্যন্ত সুরক্ষিত একটিমাত্র স্থানে কেন্দ্রীভূত করতে চাইলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক স্থান।
তবে এখনো পর্যন্ত স্যাটেলাইট ছবি ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে সেখানে নির্মাণকাজের ইঙ্গিত মিললেও, স্থাপনাটি আদৌ চালু হয়েছে কি না কিংবা সেখানে বড় আকারের পারমাণবিক অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে কি না—সেটি নিশ্চিত নয়। ফলে এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্গে সামরিক হামলা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।