ক্রীড়া ডেস্ক
মাঠের লড়াইয়ে সেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ডিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড’, আর মাঠের বাইরে ফকল্যান্ড যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস—আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বৈরিতা কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শিকড় ছড়িয়ে আছে রাজনীতিতেও। দীর্ঘ দুই যুগ পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মেগা মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। আগামী বুধবার (১৫ জুলাই) আটলান্টার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ৭৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ। আর এই মহারণকে কেন্দ্র করে মাঠ ও মাঠের বাইরে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা, যার ফলে পুরো আটলান্টা শহরজুড়ে জারি করা হয়েছে ‘রেড অ্যালার্ট’।
আটলান্টা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ফিফার টিকিট বণ্টন নীতি। সাধারণত হাই-রিস্ক ম্যাচগুলোতে দুই দেশের সমর্থকদের আলাদা গ্যালারিতে বসার ব্যবস্থা থাকলেও, এবার সাধারণ ক্যাটাগরিতে বিক্রি হওয়া টিকিটের কারণে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হাজার হাজার সমর্থক বসবেন পাশাপাশি। স্ব-স্ব ফুটবল ফেডারেশনের নির্ধারিত গ্যালারি ছাড়া গ্যালারির বাকি অংশে সমর্থকদের আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। কোয়ার্টার ফাইনালে যথাক্রমে সুইজারল্যান্ড ও নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখা দুদেশের অনুরাগী ও প্রবাসী সমর্থকদের ৫০-৫০ উপস্থিতিতে পুরো স্টেডিয়ামটি একটি উত্তপ্ত বারুদাগারে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ। যেকোনো ধরনের দাঙ্গা, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে স্টেডিয়াম, বিনোদন কেন্দ্র এবং জনবহুল এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো আটলান্টাকে রূপ দেওয়া হয়েছে এক কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে।
অবশ্য মাঠের বাইরের এই যুদ্ধংদেহী আবহ ও বিতর্ককে একদমই উসকে দিতে রাজি নন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি। হাইপ এড়িয়ে বেশ শান্ত ও পরিপক্ব ভাষায় তিনি বলেন, "আমার বার্তা খুবই পরিষ্কার—এটি স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ, এর বেশি কিছু নয়। আমরা চমৎকার একজন কোচের অধীনে থাকা ভীষণ কঠিন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। তবে দিনশেষে এটি কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ এবং আমাদের ভাবনায় শুধু মাঠের খেলাই থাকবে।"
যদিও সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধ নিয়ে গান গাওয়ার ঘটনাটি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে রাজনৈতিক এই বিতর্ককে মাঠের বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল। ক্যানসাস সিটিতে ম্যাচ শেষে ডি পল নিজের আবেগ প্রকাশ করে বলেন, "এই ম্যাচটি ডিয়েগোর ৮৬-র সেই কীর্তি এবং আমাদের গানগুলোর মাধ্যমে ফকল্যান্ড যুদ্ধের বীরদের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়, এটা সত্যি। তবে আমাদের বুঝতে হবে, ফকল্যান্ড বা মালভিনাস নিয়ে আলোচনা করার জায়গা এটি নয়; মাঠে আমাদের মূল মনোযোগ কেবল ফুটবলেই রাখা উচিত।" সব মিলিয়ে মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে দুই দেশের ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, যার উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে আটলান্টার বাতাসেও।