ইমরুল কয়েস
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পনা নয়; এটি এখন বাস্তবতা। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাতেও AI-এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাহক সেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজেও AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে ব্যাংকিং সেবার মান যেমন উন্নত হচ্ছে, তেমনি কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমার সাপোর্ট এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের ফলে গ্রাহকরা আগের চেয়ে দ্রুত ও সহজে সেবা পাচ্ছেন। একসময় একটি হিসাব খোলা, ঋণের আবেদন বা কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যাংকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন অনেক কাজই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর অন্যতম বড় সুবিধা হলো বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা। ব্যাংকগুলো গ্রাহকের লেনদেনের ধরণ বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করতে পারছে। ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে ঝুঁকি কমছে এবং সেবার গতি বাড়ছে।
তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে একটি স্বাভাবিক উদ্বেগও তৈরি হয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে? অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকের প্রচলিত অনেক পদ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বাস্তবতাও আংশিকভাবে তাই। যেসব কাজ বারবার একই নিয়মে সম্পন্ন হয়, সেসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প হয়ে উঠছে। ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক তথ্য যাচাই, সাধারণ গ্রাহক প্রশ্নের উত্তর প্রদান ইত্যাদি কাজ ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেছে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রযুক্তি শুধু চাকরি কমায় না; নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি করে। একসময় কম্পিউটার আসার পরও একই ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। অথচ পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে লাখো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। AI-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যেতে পারে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে ডেটা অ্যানালিস্ট, AI সুপারভাইজার, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল রিস্ক ম্যানেজার এবং প্রযুক্তি-নির্ভর গ্রাহকসেবা বিশেষজ্ঞের চাহিদা বাড়বে।
সুতরাং কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতার উন্নয়ন। শুধুমাত্র প্রচলিত ব্যাংকিং জ্ঞান এখন আর যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং AI-ভিত্তিক সিস্টেম সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে হবে। যারা সময়ের সঙ্গে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারবেন, তারাই ভবিষ্যতের ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্ব দেবেন।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। AI যেন কর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হিসেবে কাজ করে, সেই পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ই হবে ভবিষ্যতের সফল ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য AI একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। সুযোগ হলো আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং দ্রুত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। চ্যালেঞ্জ হলো কর্মীদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। তাই এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সুষম দৃষ্টিভঙ্গি।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, AI মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তোলার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যে ব্যাংক ও তার কর্মীরা এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারবে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তারাই এগিয়ে থাকবে। প্রযুক্তির এই নতুন যুগে টিকে থাকার নয়, বরং নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতিই হওয়া উচিত ব্যাংকারদের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক: ব্যাংকার