ক্রীড়া ডেস্ক
সম্প্রতি ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারকে স্মার্ট ভেস্ট ব্যবহার করতে দেখা যায় ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বাধিক পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সাম্বা ফুটবলের দেশ মানেই বিশ্বমঞ্চে ট্রফির প্রধান দাবিদার। তবে গত পাঁচটি আসরে আশানুরূপ সাফল্য না পাওয়ায়, ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের শতভাগ উজার করে দিতে প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর বড় বাজি ধরছে সেলেসাওরা।
খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও চোটের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ব্রাজিল ফুটবল দল। মূলত মাঠের সেরা কম্বিনেশন বেছে নিতে এবং খেলোয়াড়দের ফিটনেস বুঝতে কোচ কার্লো আনচেলত্তি ও তার ম্যানেজমেন্টের জন্য বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডেটা।
কী এই ট্র্যাকিং ভেস্ট?
ব্রাজিলের ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক স্তরের ফুটবলাররা জার্সির নিচে স্পোর্টস ব্রার মতো দেখতে এক ধরনের বিশেষ 'স্মার্ট ভেস্ট' পরিধান করেন। সেন্সরযুক্ত এই ভেস্টে রয়েছে হার্ট-রেট ইলেকট্রোড এবং জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের স্প্রিন্ট স্পিড (গতি), হার্ট রেট (হৃদস্পন্দন), ক্লান্তি এবং চোট কাটিয়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত ট্র্যাক করা হয়।
ব্রাজিল জাতীয় দলের স্পোর্টস সায়েন্স প্রধান গুইলহার্ম পাসোস জানান, ক্লাব ফুটবলে ব্যস্ত থাকার সময়েও খেলোয়াড়দের এই ট্র্যাকিং ডেটা নিয়মিত তাদের কাছে পাঠানো হয়। যেহেতু জাতীয় দলের কোচরা খেলোয়াড়দের সাথে খুব কম সময় কাটানোর সুযোগ পান, তাই হাজার মাইল দূরে থাকা ফুটবলারদের শারীরিক অবস্থার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে এই প্রযুক্তি দুর্দান্ত ভূমিকা রাখছে।
কৌশল নির্ধারণ ও চোট ব্যবস্থাপনা
কোন খেলোয়াড় ম্যাচ শুরু করবেন আর কাকে 'ইমপ্যাক্ট সাবস্টিটিউট' (পরিবর্তিত খেলোয়াড়) হিসেবে নামানো হবে, তা নির্ধারণে এই ডেটা সাহায্য করে। যেমন— কাউন্টার-অ্যাটাকিং বা প্রতি-আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য কোন গতিশীল উইঙ্গার উপযুক্ত, তা সহজেই পাসোসের টিম চিহ্নিত করতে পারে। এছাড়া হ্যামস্ট্রিং চোটের মতো জটিল সমস্যা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের ওপর শারীরিক চাপ কতটা (প্লেয়ার লোড), তা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করে কোচিং স্টাফদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, যাতে পুনরায় চোট পাওয়ার ঝুঁকি কমে।
ডেটাই শেষ কথা নয়, প্রাধান্য পাচ্ছে হিউম্যান জাজমেন্ট
তবে স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের মতে, ফুটবলে ডেটাই শেষ কথা নয়। গুইলহার্ম পাসোস একটি দারুণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, ট্র্যাকিং ডেটায় দেখা গেছে এক খেলোয়াড় পুরো ম্যাচে মাত্র ৬ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যেখানে অন্য সতীর্থরা প্রায় দ্বিগুণ দৌড়েছেন। খালি চোখে তাকে অলস মনে হলেও, ম্যাচের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়— সেই ফুটবলার মাঠে সবসময় একদম পারফেক্ট ট্যাকটিকাল পজিশনে বা সঠিক জায়গায় অবস্থান করছিলেন। অর্থাৎ, কম দৌড়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত ইফেক্টিভ (কার্যকর)।
তাই ফুটবলকে অ্যাথলেটিক্সের সাথে তুলনা করা ভুল হবে। পাসোস জোর দিয়ে বলেন, কেবল ভালো ফিজিক্যাল মেট্রিক্স থাকলেই একজন খেলোয়াড় দলে সুযোগ পাবেন এমন নয়; টেকনিক্যাল দক্ষতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কোচের খেলার স্টাইলের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাপনাই আসল।
বিশ্বকাপে এবার ফিফা ও লেনোভোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত 'ফুটবল এআই প্রো' এসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করা হলেও, ব্রাজিল দলের মতে মূল পার্থক্যটা গড়ে দেয় 'হিউম্যান জাজমেন্ট' বা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। প্রযুক্তি কেবল পথ দেখাবে, তবে মাঠের রণকৌশল সাজানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কোচরাই।