এম জামান
যশোর সদরের মাঠজুড়ে এখন করলা চাষ ছবি: ধ্রুব নিউজ
‘বাজারের সবজিতে কী যাদু আছে তা বুঝতে পারিনে। আমরা মাঠে খেটে, রোদে পুড়ে, রাতে জেগে, সার-বিষ-তেল মেখে যে সবজি ৫০ টাকা বিক্রি করি, বাজারে গেলেই তা একশ টাকা হয়ে যায়। বাজারের যাদুটা যদি জানতে পারতাম, তাহলে তাই করতাম।’
যশোর সদরের বীর নারায়ণপুর গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ ও আক্ষেপ মেশানো কণ্ঠে সবজি চাষের বর্তমান অবস্থা জানাচ্ছিলেন কৃষক আব্দুল মান্নান। তার এই সখেদ মন্তব্যই বলে দেয়, হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া বিনিয়োগের পর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার যন্ত্রণা কতটা তীব্র।
বর্তমানে যশোরে করলাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। জেলার মাঠে মাঠে এখন সবুজে ঘেরা ফসলের ক্ষেত। চলছে নিবিড় পরিচর্যা। কেউ নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ আবার সেচের পানি দিচ্ছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে মাঠ।
চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সবজি ও করলা গাছের বৃদ্ধি বেশ ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে ফসলের ফলনও শুরু হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে দাম কিছুটা ভালো থাকায় কৃষকের মনে আশার সঞ্চার হলেও, নেপথ্যের বাজার সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
কৃষকরা জানান, করলাসহ যেকোনো সবজি চাষে খরচ এখন তুলনামূলক অনেক বেশি। বীর নারায়ণপুর ও ফুলবাড়ী গ্রামের একাধিক চাষি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে সার, কীটনাশক ও তেলের দাম আকাশচুম্বী। এত খরচের পর সঠিক দাম পাওয়া গেলে তবেই লাভবান হওয়া সম্ভব। কিন্তু মাঠ থেকে সবজি হাতবদল হওয়া মাত্রই এক অদৃশ্য যাদু বা কারসাজিতে দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। অথচ উৎপাদনকারী কৃষক সেই লভ্যাংশের সামান্যতমও পান না। বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর নজরদারি ও কড়া তদারকি না থাকলে কৃষকদের বাঁচা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা জানান।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছর যশোর জেলায় মোট ৩ হাজার ৬৩৭ বিঘা জমিতে কেবল করলারই আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে যশোর সদর উপজেলায়। সদরের লেবুতলা, ইছালী, হৈবতপুর ও চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের মাঠের পর মাঠ এখন সবজির ক্ষেতে ভরপুর। কেবল বাজারজাত শুরু হওয়া এই ফসলের প্রারম্ভিক দর ভালো থাকলেও, তা কতদিন টিকবে—সেই শঙ্কায় দিন কাটছে চাষিদের।
যশোর কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) সমরেন বিশ্বাস বলেন, “বাংলাদেশের মধ্যে যশোর একটি বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদনকারী জেলা। এখানকার উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জেলার চাহিদা পূরণ করে থাকে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কৃষকরা নিবিড় পরিচর্যা করছেন, আশা করছি ফলন ভালো হবে।”
বাজারে দামের এই বিশাল ব্যবধান ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে বাজারদর ভালো রয়েছে। তবে বাজারে যাতে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ নজরদারি করবে। কৃষকদের সবসময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”