Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

রক্তফল, পাহাড় থেকে সমতলে

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ মে,২০২৬, ০৯:২৮ এ এম
আপডেট : শুক্রবার, ১৫ মে,২০২৬, ১০:৫৬ এ এম
রক্তফল, পাহাড় থেকে সমতলে

পাহাড়ের গাছে ঝুলছে টসটসে রক্তফল ছবি: সংগৃহীত

রক্তফল! নাম শুনে চমকে উঠতেই পারেন। রক্ত দিয়ে তৈরি কোনো ফল নয় এটি। রক্তের মতো টকটকে লাল রং বলেই নাম হয়েছে রক্তফল বা ব্লাড ফ্রুট। পাহাড়ের বনজঙ্গলে জন্মানো এই বুনো ফল বহু বছর ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের পরিচিত। তবে এখন ধীরে ধীরে তা সমতলেও ছড়িয়ে পড়ছে। নাম, রং আর পুষ্টিগুণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর বেড়েছে চাহিদাও।

বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক ফল বিক্রেতাদের কাছে এখন নিয়মিত খোঁজ পড়ছে রক্তফলের। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় সরবরাহে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিক্রেতাদের। সমতলের মানুষ একে রক্তফল নামে চিনলেও পাহাড়ি জনপদে এর রয়েছে নানা নাম। চাকমাদের কাছে এটি ‘রসকো’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘তাইচক’, মারমা ভাষায় ‘রানগুয়চি’। কেউ কেউ আবার ‘রক্ত গোটা’, ‘লালগুলা’ নামেও ডাকেন। ইংরেজি নাম ব্লাড ফ্রুট। হিন্দিতে ডাকা হয় ‘খুন ফল’ নামে।

সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিন এবং প্রতি ১০০ গ্রামে ১ হাজার ৮৯০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এতে উচ্চমাত্রার পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

আঙুরের মতো থোকায় ধরে ফল। আকারে কিছুটা বড়। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে রক্তের মতো লাল। স্বাদে টক-মিষ্টি। একসময় শুধু পাহাড়ের গভীর বনেই দেখা মিলত এই ফলের। এখন পাহাড়ি কৃষকেরা বাড়ির আঙিনাতেও এর চাষ করছেন।

গবেষণায় মিলেছে পুষ্টিগুণের তথ্য

ভারতের একদল গবেষক রক্তফল নিয়ে গবেষণা করেন। ভারতের মেঘালয়ের পাঁচটি পাহাড়ি অঞ্চলের ফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা পুষ্টিগুণ, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। গত বছর গবেষণাটি প্রকাশিত হয় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড রিসার্চ সাময়িকীতে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, রক্তফল বা Haematocarpus validus দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর ফল। উচ্চতাভেদে ফলটির গঠন, স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসে। ফলে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিন এবং প্রতি ১০০ গ্রামে ১ হাজার ৮৯০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পটাশিয়াম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এতে উচ্চমাত্রার পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

গবেষণায় ফাইটেট, অক্সালেট, স্যাপোনিন ও নাইট্রেটের মতো কিছু উপাদানের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা বলছেন, এসব উপাদানের প্রভাব সীমিত। পরীক্ষাগারে ইঁদুরের ওপর চালানো বিষাক্ততা পরীক্ষায়ও কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া যায়নি। গবেষণায় বলা হয়েছে, রক্তফল খাওয়ার জন্য নিরাপদ এবং ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্য, পুষ্টি পণ্য ও ওষুধশিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড়ের ৩০০ মিটার উচ্চতার এলাকার ফলে সবচেয়ে বেশি মিষ্টতা, দৃঢ়তা ও ফলন পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ওই এলাকার ফলে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও আয়রনের মাত্রাও ছিল সর্বোচ্চ।

বন থেকে আঙিনায়

বর্ষার আগমুহূর্তে বাজারে আসে এই ফল। একসময় শুধু পাহাড়ের বনজঙ্গলেই হতো এই ফল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে। তাই বন থেকে এখন মানুষের আঙিনায় ঠাঁই হচ্ছে এই ফল গাছের। অনেকেই এই গাছের লতা রোপণ করেছেন। ফলও পাচ্ছেন নিয়মিত।

রাঙামাটির নানিয়ারচরের কৃষক লক্ষ্মী নারায়ণ চাকমা এখন বাণিজ্যিকভাবে রক্তফলের চাষ করেন। একসময় ধান, বাতাবিলেবুসহ নানা ফলের চাষ করলেও ১২ থেকে ১৫ বছর আগে তাঁর জমিতে যুক্ত হয় রক্তফল।

লক্ষ্মী নারায়ণ চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগে পাহাড়ের বন থেকে ফল তুলে এনে বিক্রি করতাম। কিন্তু ফল কম পাওয়া যেত। পরে দেখি মানুষের চাহিদা বাড়ছে। তখন বন থেকে লতা এনে নিজের জমিতে লাগাই। কয়েক বছর পর ফল আসতে শুরু করে।’

লক্ষ্মী নারায়ণ চাকমা জানান, বর্তমানে তার বাগানে ১৫টির মতো গাছ রয়েছে। সব গাছে সমান ফল হয় না। তারপরও বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি ফল পান। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন মৌসুম শেষের দিকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই ফল চাষে খরচ কম। তেমন পরিচর্যাও লাগে না। দামও ভালো পাওয়া যায়। তাই এখন অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

বাজারে বাড়ছে চাহিদা

রাঙামাটির বনরূপা বাজারে ফল বিক্রি করেন জেনিট চাকমা। মৌসুমের প্রায় সব ফল পাওয়া যায় তাঁর দোকানে। এখন পাওয়া যাচ্ছে আম, রক্তফল ইত্যাদি। তিনি এখন প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি রক্তফল বিক্রি করেন। শুধু রাঙামাটি নয়, চট্টগ্রামেও ফল পাঠান তিনি।

জেনিট চাকমা বলেন, আগে শুধু স্থানীয় মানুষ কিনতেন। এখন চট্টগ্রাম থেকেও অর্ডার আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখেই অনেকে খোঁজ নেন। কোনো কোনো দিন ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি পর্যন্ত রাঙামাটির বাইরে পাঠাতে হয়। তবে অনেক সময় স্থানীয় বাজার থেকে পর্যাপ্ত ফল সংগ্রহ করতে পারেন না বলে চাহিদা অনুযায়ী পাঠাতে পারেন না।

জেনিট চাকমা জানান, মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে প্রতি কেজি ফল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝামাঝি সময়ে দাম থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলার চাষিদের কাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে শহরে এনে বিক্রি করেন তিনি।

সংরক্ষণের তাগিদ

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এটি মূলত পাহাড়ি বনের ফল। এখনো রক্তফলের উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক কোনো রেকর্ড নেই। তবে গতবারের তুলনায় এবার বাজারে দ্বিগুণের বেশি ফল দেখা যাচ্ছে। চাহিদাও বেড়েছে।

এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, গত বছর যেখানে প্রতি কেজি ফল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার তা ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তিনি আরও বলেন, এটি লতাজাতীয় উদ্ভিদ। শুরুতে লতা থাকলেও পরে কাঠের মতো শক্ত হয়ে যায়। এটি বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ। তাই সংরক্ষণ করা জরুরি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না থাকলেও ব্যক্তিপর্যায়ে চাষিদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর ভাষ্য, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে জুন পর্যন্ত রক্তফলের ফলের মৌসুম।

পুষ্টিগুণ নিয়ে দেশে এখনো বড় কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি বলে উল্লেখ করেন এই কৃষি কর্মকর্তা। তবে তাঁর মতে, রক্তফলে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। চাহিদা বাড়ায় এখন পাহাড়ি কৃষকেরা বন থেকে লতা এনে নিজেদের জমিতে লাগাচ্ছেন। চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই ফল পাওয়া যাচ্ছে। সূত্র : প্রথমআলো

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)