সারাজীবন আতলেতিকোর সমর্থকদের কাছে নিজেদের ঘরের মানুষ হয়ে থাকবেন গ্রিজম্যান ছবি: এ এফ পি
সব সম্পর্কের সমাপ্তি সুন্দর হয় না, কিন্তু কিছু বিদায় বুকের ভেতর এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যার রেশ থেকে যায় যুগ যুগ ধরে। আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং আন্তোয়ান গ্রিজম্যানের সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই। ক্লাবকে এই ফরাসি তারকা দিয়েছিলেন নিজের সবটুকু উজাড় করেই। শুধু গোল করা বা সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর (অ্যাসিস্ট) মাঝেই কখনো নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। কাগজে-কলমে ফরোয়ার্ড হয়েও অবলীলায় নেমে এসেছেন মাঝমাঠে, দলের প্রয়োজনে রক্ষণভাগ (ডিফেন্স) সামলাতেও ছুটে গেছেন নিজের ডি-বক্সের ভেতর। দলের দরকারে নিজের ব্যক্তিগত জৌলুস বা আলোর বৃত্তটাকে পাশে সরিয়ে রাখতে দ্বিধা করেননি কখনো।
ফুটবল বিশ্বে এমন খেলোয়াড় খুব বেশি আসে না, যারা কোচের পরিকল্পনা অনুযায়ী একই ম্যাচে একসাথে তিন-চারটি ভিন্ন ভূমিকা পালন করতে পারেন। গ্রিজম্যান ছিলেন ঠিক তেমনই এক অনন্য ফুটবলার। মাঠে তাকে কখনো মনে হতো নিখুঁত স্ট্রাইকার, কখনো সৃজনশীল প্লেমেকার, আবার কখনো রক্ষণ সামলানো বাড়তি একজন মিডফিল্ডার। আতলেতিকোর প্রতি তার টান এবং অনুভূতিটা ছিল একদম ভেতর থেকে, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়া।
তাই যখন বিদায়ের সেই অন্তিম মুহূর্তটি এলো, তখন ব্যাপারটা রূপ নিলো একটি যুগের সম্পর্কের অবসানে। ২০১৪ থেকে ২০২৬—মাঝখানে বার্সেলোনায় কাটানো দুইটি মৌসুম বাদ দিলে পুরোটা সময় ‘গ্রিজি’ ছিলেন আতলেতিকোর হৃদয়স্পন্দনের প্রধান অংশ।
হ্যাঁ, সেই সময়ে বার্সায় যাওয়ার সিদ্ধান্তটা অনেক মাদ্রিদ সমর্থকের মন ভেঙেছিল। গ্যালারির ভালোবাসায় ফাটলও ধরেছিল কিছুটা। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, গ্রিজম্যান কখনো নিজের সেই ভুলটা অস্বীকার করেননি। বরং অকপটেই স্বীকার করেছিলেন, নিজের ভালোবাসার মানুষদের এভাবে ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি। ফিরে আসার পর তাই সমর্থকেরাও ধীরে ধীরে আবার আপন করে নিয়েছিলেন তাকে। কারণ মানুষ ভুল ক্ষমা করে দেয়, যদি অনুশোচনা এবং ভালোবাসাটা সত্যি হয়।
গ্রিজম্যানের এই বিদায়ের দিনে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ ছিলেন ডিয়েগো সিমিওনে নিজে। গ্রিজম্যানকে তিনি শুধু একজন সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখেননি কখনো। অনেকটা নিজের সন্তানের মতো করেই আগলে রেখেছিলেন সবসময়। আর গ্রিজম্যানও সিমিওনের প্রতি সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন মাঠে নিজের নিঃশর্ত নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ দিয়ে। তাদের সম্পর্কটা কোচ আর খেলোয়াড়ের চেনা সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বহু আগেই।
গ্রিজম্যানের ক্যারিয়ারে আক্ষেপ বলতে হয়তো চিরকাল থেকে যাবে একটা লা লিগা কিংবা একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জেতার গল্প। খুব কাছে গিয়েও রূপালি ট্রফিটা ছুঁতে না পারার কষ্টটা হয়তো মনের গভীরে কোথাও থেকে যাবে আজীবন। কিন্তু ফুটবলে সব অর্জন তো আর ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু খেলোয়াড় থাকেন, যারা ট্রফির চেয়ে মানুষের হৃদয়ে বেশি জায়গা করে নেন। গ্রিজম্যান সম্ভবত তাদেরই একজন। বছরের পর বছর গ্যালারি থেকে যে অকুণ্ঠ ভালোবাসাটা তিনি পেয়েছেন, প্রতিটা ম্যাচ শেষে যে নামে পুরো স্টেডিয়াম গর্জে উঠেছে, সেটা হয়তো যেকোনো ট্রফির চেয়েও অনেক বড় অনুভূতি।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ ট্রফির সংখ্যা ভুলে যায়, কিন্তু মনে রাখে সেই মানুষটাকে—যিনি সত্যি নিজের হৃদয়টা মাঠে বিলিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।