প্রফেসর ড. মো. মাহমুদুল হাসান
নতুন বঙ্গাব্দের শুরুর মাসটি বাঙালির জীবনে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের মাস নয়, বরং বাঙালি জাতিসত্তার এক গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী প্রকাশের অংশ। এই সময়ে মানুষ পুরনো গ্লানি, ব্যর্থতা ও দুঃখকে পেছনে ফেলে নতুন আশা ও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। বছরের শুরুটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের ভাষার কথা, আমাদের পরিচয়ের কথা। আর এই পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বাংলা ভাষা। তাই নতুন বছরের চেতনায় শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও আবেগের ধারক। হাজার বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় সাহিত্য, তারপর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উত্থান—সবকিছুই এই ভাষার সমৃদ্ধিকে বহুগুণে বাড়িয়েছে। ভাষার এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ভাষা আন্দোলন, যা আমাদের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে ভাষার প্রতি ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, বরং দায়িত্বও।
তবুও বর্তমান সময়ে আমরা লক্ষ করি যে শুদ্ধ বাংলার চর্চা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নগরজীবনে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি বা অন্য ভাষার অপ্রয়োজনীয় মিশ্রণ একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। “বাংলিশ” নামে পরিচিত এই মিশ্র ভাষা অনেক সময় যোগাযোগকে সহজ করলেও তা ধীরে ধীরে আমাদের ভাষার স্বকীয়তা ও শুদ্ধতাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে উচ্চারণের ভুল, বানানের ত্রুটি এবং ব্যাকরণগত অসঙ্গতি ভাষার সঠিক রূপকে বিকৃত করে তুলছে।
বছরের শুরু আমাদের সামনে একটি নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দেয়। আমরা যদি এই সময়টিকে উপলক্ষ করে নিজেদের ভাষা ব্যবহারের দিকে নজর দেই, তবে তা হতে পারে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা মানে শুধু কঠিন বা আড়ম্বরপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা নয়; বরং সহজ, সাবলীল এবং সঠিক ভাষায় নিজেদের ভাব প্রকাশ করাই শুদ্ধ কথনের মূল লক্ষ্য। এটি আমাদের ব্যক্তিত্বকে আরও সুসংহত করে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দৃঢ় করে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুদ্ধ ভাষা চর্চার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। স্কুল-কলেজে যদি শিক্ষার্থীদের সঠিক উচ্চারণ, বানান ও ব্যাকরণ শেখানো হয় এবং তা নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা স্বাভাবিকভাবেই শুদ্ধ বাংলার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। পাঠ্যবই, সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিতর্ক, আবৃত্তি ও রচনা প্রতিযোগিতা—এসবের মাধ্যমে ভাষা চর্চাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব। শিক্ষকরা যদি নিজেরাও শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার করেন, তবে শিক্ষার্থীরা তা অনুসরণ করতে উৎসাহিত হবে।
শিশুদের অনলাইন গেমআসক্তি দূর করতে প্যারেন্টিং কৌশল
পরিবারও ভাষা শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিশুরা তাদের প্রথম ভাষা শেখে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা এবং তাদের ভুল সংশোধন করা। একই সঙ্গে বাংলা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি। গল্প, কবিতা, ছড়া—এসবের মাধ্যমে শিশুরা ভাষার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য উপলব্ধি করতে পারে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বর্তমান সময়ে অত্যন্ত ব্যাপক। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যদি শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে তা মানুষের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই সংক্ষিপ্ত, বিকৃত বা ইংরেজি মিশ্রিত ভাষা ব্যবহার করি। এটি অনেক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়। তাই সচেতনভাবে শুদ্ধ বাংলায় পোস্ট, মন্তব্য ও বার্তা লেখার চেষ্টা করা উচিত। এটি একদিকে যেমন আমাদের ভাষা দক্ষতা বাড়াবে, অন্যদিকে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়. বর্তমানে বিভিন্ন বাংলা কীবোর্ড, ফন্ট এবং সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, যা বাংলা লেখাকে সহজ করে তুলেছে। ইউনিকোড প্রযুক্তির ফলে বাংলা ভাষা বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট তৈরি করি, তবে তা ভাষার প্রসার ও শুদ্ধতা রক্ষায় সহায়ক হবে।
বছরের শুরুর দিনে বিভিন্ন আয়োজন—আনন্দ র্যালি, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ মেলা—এসবই আমাদের ঐতিহ্যের প্রতিফলন। এই আয়োজনগুলোতে শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার আরও জোরদার করা যেতে পারে। যেমন, অনুষ্ঠান পরিচালনা, গান, আবৃত্তি, নাটক, ছাত্রছাত্রীদের বাংলা উপস্থাপন বক্তৃতা, বাংলা প্রবন্ধ লেখা প্রতিযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এতে করে উৎসবের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষ ভাষার প্রতি নতুন করে আগ্রহী হবে।
ক্যারিয়ার উন্নয়নে বহুভাষা শিক্ষা
বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি আমাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সঙ্গেও জড়িত। একটি ভাষা যত শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা যায়, ততই চিন্তা ও ভাব প্রকাশ পরিষ্কার ও সুসংগঠিত হয়। তাই শুদ্ধ বাংলায় কথন আমাদের চিন্তাশক্তিকেও উন্নত করে।
তবে শুদ্ধ ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে শুদ্ধ বাংলা কঠিন বা অপ্রয়োজনীয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে আধুনিক জীবনে ইংরেজির প্রাধান্যের কারণে বাংলা ভাষার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। এই ধারণাগুলো ভুল। বাস্তবে, একাধিক ভাষা জানা একটি দক্ষতা হলেও নিজের মাতৃভাষায় পারদর্শিতা অর্জন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাতৃভাষাই আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতার মূল ভিত্তি।
সামগ্রিক বিকাশে শিশুর ১০টি জীবন দক্ষতা
বছর শুরুর আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা যদি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিজ্ঞা করি—“আমরা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলব”—তবে তা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়; বরং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সহজেই অর্জন করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, নতুন বছরের শুরু আমাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। এই সম্ভাবনাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে আমাদের নিজেদের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। আর সেই শিকড়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আমাদের ভাষা। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে শপথ নিই—বাংলায় শুদ্ধ কথা বলাই হবে আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয় এবং নতুন বছরের চেতনার মূল ভিত্তি।
লেখক: কলামিস্ট ও প্যারেন্টিং পরামর্শক, প্রিন্সিপাল, নাফেঈন ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি এবং প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
* মতামত লেখকের নিজস্ব