Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ব্যাংকিং পেশার বিড়ম্বনা: গ্ল্যামার আর বাস্তবতার ব্যবধান

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : শনিবার, ৪ এপ্রিল,২০২৬, ১২:০৩ পিএম
আপডেট : শনিবার, ৪ এপ্রিল,২০২৬, ১২:২৭ পিএম
ব্যাংকিং পেশার বিড়ম্বনা: গ্ল্যামার আর বাস্তবতার ব্যবধান

গ্রামগঞ্জে এখনো একটি কথা প্রচলিত আছে— "চাকরি করলে ব্যাংকে, না হয় র‌্যাংকে।" এখানে 'র‌্যাংক' বলতে শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মানজনক চাকরিগুলোকে বোঝানো হলেও, ব্যাংকিং পেশাকে দেখা হয় আভিজাত্য আর সচ্ছলতার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা কি আমরা কখনো দেখেছি? ২০০৪ সালের ১১ই ডিসেম্বর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-তে প্রবেশনারী অফিসার হিসেবে আমার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ দুই দশক পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এই পেশাটি যতটা 'লুক্রেটিভ', তার চেয়েও বেশি সেনসিটিভ এবং বিড়ম্বনাপূর্ণ।

কেন এসেছিলাম এই পেশায়?

২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে আমাদের মত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে প্রাইভেট ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ছিল স্বপ্নের মত। প্রথম শ্রেণির বিসিএস বা ব্যাংকিং সেক্টরকে আমরা মনে করতাম অত্যন্ত অ্যারিস্টোক্রেটিক। সেই মোহ থেকেই এই পেশায় আসা। কিন্তু জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা যেমন তিক্ত, তেমনি শিক্ষণীয়।

বিড়ম্বনার কেন্দ্রবিন্দু: 'পাবলিক ডিমান্ড' ও ভুল ধারণা

চাকরি জীবনের শুরু থেকেই আমাকে ঘিরে এক বিশাল 'পাবলিক ডিমান্ড' তৈরি হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ডিমান্ডের প্রায় পুরোটাই অর্থনৈতিক। মানুষের ধারণা— ব্যাংকার মানেই টাকার পাহাড়!

বাবার প্রতি ভালোবাসা বনাম সামাজিক চাপ: মনে আছে, ক্যারিয়ারের শুরুতে যখন ৯,৬০০ টাকা বেতন পেতাম, তখন বাবাকে ৫,০০০ টাকা দিতাম। বাবা গ্রামের হাটে বাজার করতেন, বাকিও থাকতো। দোকানদাররা বাবাকে বলতেন, "চাচা, আপনার ছেলে ব্যাংকের বড় অফিসার, টাকা নিয়ে টেনশন কীসের!" এই যে পাবলিক পারসেপশন, এটা মেটাতে গিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হতো। কেউ বোঝে না যে আমরা একটি নির্দিষ্ট বেতনের সীমাবদ্ধতায় চলি।

শ্বশুরবাড়ির 'টাকার কুমির': বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে জামাই মানেই যেন আলাদিনের চেরাগ। তারা মনে করেন, জামাইয়ের কাছে ব্যাংকের সব টাকা গচ্ছিত আছে। যেকোনো দাওয়াতে অন্য আত্মীয়রা কী উপহার আনলো সেটা বড় কথা নয়, সবাই তাকিয়ে থাকে— "ব্যাংকার সাহেব কী এনেছেন!"

একটি করুণ গল্প: বাবার পকেটে কেন টাকা নেই?

আমার পরিচিত এক ক্যাশ ইনচার্জের কথা মনে পড়ছে। তার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেটি মাসের পর মাস একটি সাইকেলের জন্য বায়না ধরছিল। বাবা বলছিলেন, "সামনের মাসে বেতন পেলে কিনে দেবো।" একদিন প্রতিবেশী এক ভদ্রলোক দুষ্টামি করে ছেলেটিকে ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে ভল্ট আর টাকার বান্ডিল দেখিয়ে বললেন, "দেখো, তোমার বাবা কত টাকার মালিক! সব টাকা ব্যাংকে রেখে আসে, বাসায় আনে না।" সেই রাতে ছেলেটি তার বাবার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিল। সে বিশ্বাসই করতে পারলো না যে, অত টাকার মাঝে বসে থাকা মানুষটির পকেটে আসলে নিজের সন্তানের জন্য একটা সাইকেল কেনার টাকা নেই। এই হলো একজন ব্যাংকারের জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

কৃতজ্ঞতাহীন সেবার জগৎ

ব্যাংকিং পেশায় মানুষকে সন্তুষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। ১. বিনিয়োগ বা লোন বিড়ম্বনা: ধরুন, একজন গ্রাহককে আপনি নিজের সাধ্যের অতীত চেষ্টা করে ৩০ লাখ টাকা লোন পাইয়ে দিলেন (যেখানে তার যোগ্যতা ছিল ২০ লাখের)। আপনি চলে যাওয়ার পর সেই গ্রাহকই হয়তো বলবেন, "ওই লোকটা না থাকলে আমি ৫০ লাখ টাকা লোন পেতাম!" ২. ক্যাশ সার্ভিসের তিক্ততা: একজন ক্যাশ অফিসার হাজার দিন একজন গ্রাহককে ভালো নোট দিয়ে, ছেঁড়া টাকা বদলে দিয়ে সেবা দিলেও, একদিন যদি কোনো কারণে একটি ছোট অনুরোধ রাখতে না পারেন, তবে মুহূর্তেই গ্রাহক সব পুরনো উপকার ভুলে গিয়ে চড়াও হন।

উৎসবের মৌসুমে নতুন টাকার যন্ত্রণা

ঈদের সময় নতুন টাকার চাহিদা সামলানো এক ভয়াবহ বিড়ম্বনা। আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীকে নতুন টাকা দিলে তারা অনেক সময় মনে করেন এটা 'হাদিয়া'। ১০০০ টাকার নতুন বান্ডিল নিয়ে ১০০০ টাকার পুরনো নোট ফেরত দেওয়ার কথা তারা ভুলেই যান! না দিতে পারলে তো মুখ কালো করার পালা চলেই।

বেতন বনাম প্রত্যাশার ব্যবধান

আমি কত টাকা বেতন পাই, তা আমি জানার আগেই আমার প্রতিবেশীরা মেপে ফেলে। ২০ হাজার টাকা বেতন পেলে লোকে ভাবে ৫০ হাজার, আর ১ লাখ পেলে ভাবে ২ লাখ! এই কাল্পনিক বেতনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় তাদের বিশাল প্রত্যাশার পাহাড়।

টাকা ধার দেওয়ার বিড়ম্বনা

ব্যাংকার মানেই যেন টাকা ধার দেওয়ার একটি নিরাপদ আধার। কিন্তু এখানে দুটি ঘটনা ঘটে:

টাকা ফেরত দেওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর মনেই করেন না। কারণ, "আপনি তো ব্যাংকার, আপনার অনেক টাকা!"

আর যদি কখনো বিশেষ প্রয়োজনে নিজের টাকা ফেরত চান, তবে নিশ্চিত থাকুন সেই দীর্ঘদিনের সম্পর্কটি চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।

পেশাগত ঝুঁকি: ভুলের কোনো ক্ষমা নেই

ব্যাংকিং পেশায় অনিচ্ছাকৃত ভুলের মাশুলও অনেক সময় জীবন দিয়ে দিতে হয়।

ক্যাশ ও ফরেন এক্সচেঞ্জ: একটি ভুল পেমেন্ট বা ওভার/আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের খেসারত দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা অডিট সেকশনের যে যন্ত্রণার শিকার হতে হয়, তা অবর্ণনীয়।

ইনভেস্টমেন্ট ডকুমেন্টেশন: আপনি হয়তো অনেক যাচাই করে লোন দিয়েছেন, কিন্তু রিটায়ারমেন্টের সময় দেখা গেল সেই দলিলটি ছিল জাল। এর সাথে আপনার কোনো যোগসূত্র না থাকলেও পুরো দায়ভার আপনার ওপর এসে পড়ে। রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পাওয়ার সময় জীবনটা প্রায় জাহান্নাম হয়ে যায়।

সৌজন্য যেখানে বিরল

একবার এক প্রবাসী ভদ্রলোকের অনুরোধে অনেক কষ্ট করে দ্রুততম সময়ে একটি ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলাম। শুরুতে তিনি খুব কৃতজ্ঞতা দেখালেও কাজ শেষ হওয়ার পর বললেন, "আপনি আমার ওপর দয়া করেননি, এটা আমার অধিকার ছিল। কাজ না হলে আমি আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতাম!"

এভাবেই জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে বিড়ম্বনা, তিক্ততা আর প্রত্যাশার চাপ সহ্য করে একজন ব্যাংকারকে এগিয়ে যেতে হয়। বাইরের চাকচিক্য দেখে যারা আমাদের বিচার করেন, তারা হয়তো কখনোই জানবেন না— দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কতটা নিঃসঙ্গ আর ভারাক্রান্ত।

(এই লেখাটি লেখকের ২০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা 'ব্যাংকিং পেশার বিড়ম্বনা' বইটির একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।)

লেখক: একটি প্রাইভেট ব্যাংকে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)