বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

আতশবাজির উন্থান অর্থহীন

আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ জানুয়ারি,২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
আতশবাজির উন্থান অর্থহীন

"আতশবাজি মানেই আনন্দ নয়, এটি হতে পারে প্রাণঘাতী কোনো অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। আপনার সামান্য অসতর্কতা তছনছ করে দিতে পারে একটি সাজানো সংসার। উৎসব হোক নিরাপদ, সমাজ হোক শঙ্কামুক্ত।

৩১ ডিসেম্বর রাত বারোটার সময় নানা রকম নিষিদ্ধ আনন্দ-ফূর্তি অশ্লীলতা মদ্যপান নাচ-গান ওবেহায়াপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে থার্টি ফাস্ট নাইট, যদিও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের শোক পালিত হচ্ছে। এই অপসংস্কৃতির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হল আতশবাজি করা ।   নববর্ষ উদযাপনের সময় আতশবাজি, পটকা ও আলো-উৎসবের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে থাকায় এই আনন্দের অনুষ্ঠান বড় ধরনের মানব, সামাজিক ও পরিবেশগত আঘাত তৈরির সম্ভাবনা রাখে। সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে দেখা গেছে,  পশ্চিমা দেশগুলোতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও আতশবাজির কারণে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে বরং তা প্রশ্ন তোলে আমাদের উৎসবসংস্কৃতি, নিরাপত্তা নীতি ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি রাতে সুইজারল্যান্ডের ক্রান্স-মোনটানা অঞ্চলে একটি বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নতুন বছর উদযাপনের সময় সেখানে হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটে, ফলে অন্তত ৪০ জন নিহত এবং প্রায় ১১৫ জন আহত হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে এই হতাহত আতশবাজির কারণে।নিহতদের বেশিরভাগই তরুণ এবং বহু আন্তর্জাতিক পর্যটক ছিলেন। এই ঘটনা হয়তো সরাসরি একটি আতশবাজির কারণে না হলেও উৎসবের মধ্যে অব্যবস্থাপনার উশৃংখলতার ফলে অগ্নিকাণ্ড তীব্র আকার নিয়েছে।

এই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধদের চিকিৎসা করতে স্থানীয় হাসপাতালগুলোও অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন হয়েছে এবং সমগ্র সুইজারল্যান্ডে শোকের

২০২৬ সালের নববর্ষ উদযাপনে নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি-সম্পর্কিত দুর্ঘটনায় কমপক্ষে দুইজন মারা গেছেন—একজন ৩৮ বছর বয়সী ব্যক্তি এবং একজন কিশোর। পাশাপাশি নতুন বছর অনুষ্ঠানে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীদের লক্ষ্য করে নিষ্ক্রিয় আতশবাজি ও আগুন নিক্ষেপ করা হয়।

এ ছাড়াও আমস্টারডামের একটি ঐতিহাসিক গির্জা ‘ভন্ডেল কার্ক আগুনে ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষতি ব্যাপক পরিমাণে হয়েছে।

এদিকে নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির পুরোনো ঘটনাগুলোতেও বড় ধরনের হতাহতের কর্মদর্শন রয়েছে,১৯৯১ সালের কিউলেনবার্গ আতশবাজি দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত এবং বহু আহত হয়েছিল।

২০২৪/২০২৫ সালের বর্ষবরণে জার্মানির বিভিন্ন শহরে আতশবাজি ব্যাবহারের ফলে কমপক্ষে ৫ জন নিহত হয়ে ছিলেন এবং শতাধিক আহত হয়েছিল। এই মৃত্যু-হতাহতের ঘটনা ছিল আতশবাজি ও অনিয়ন্ত্রিত পটকার কারণে, যা নিরাপত্তা উদ্বেগ জাগিয়ে দিয়ে বারংবার নিয়মকানুন কঠোর করার দাবি তুলেছে।

থাইল্যান্ডে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে একটি আতশবাজি কর্মশালার বিস্ফোরণে অন্তত ৯ জন নিহত হয় এবং আরও অনেকে আহত হন। একই প্রদেশে পূর্বে ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও আতশবাজি-সম্পর্কিত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে বহু মানুষ মারা গেছে।

এছাড়া ২০১৩ সালের কোতদ্বীপে (আইভরি কোস্ট)  থার্টিফার্স্ট নাইট ইভেন্ট শেষে আতশবাজি ও জনসমাগমের ভিড়ে পদদলিত হয়ে ৬১ জন নিহত হয়, যা একটি অন্যতম বড় নববর্ষ উদযাপনে জনসমাগম-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা হিসাবেও বিবেচিত।

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে বর্ষবরণ বা উৎসবের সময়

সাধারণভাবে আতশবাজি, পটকা ও বিস্ফোরণ ঘটলে ছোট-ব্যক্তিগত জায়গায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আবাসিক এলাকা, সংকীর্ণ গলি ও পুরোনো ভবনের কারণে দ্রুত হতাহতের ঝুঁকি থাকে।

আতশবাজি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও রসায়নিক বায়ুদূষণ বাড়ায়, যা শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা ও পরিবেশের ক্ষতি করে।বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা এ ক্ষেত্রে বেশি আক্রান্ত হয়।

বাংলাদেশে বস্তিবাসী এলাকা, নির্মাণাধীন ভবন ও খোলা জমির পরিবেশে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত ফায়ার সার্ভিস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে ক্ষতি আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

ইসলামে আল-মুহিম হলো আনন্দ উদযাপন নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে করা। অপচয় (ইসরাফ) এবং অন্যের ক্ষতি বা বিপদ সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। কুরআনে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা বনি ইসরাইল)

অতএব, আত্মীয়/বন্ধুদের সাথে আনন্দ ভাগ করা ইসলামে অনুমোদিত হলেও, পরিবেশ, প্রাণহানি ও সামাজিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করা ইসলাম স্পষ্টভাবে নিন্দা করে। বিশেষ করে আগুন নিয়ে বা আতশবাজি করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বড় বড় ঘটনায় দেখা গেছে যে বর্ষবরণের সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও আত্মীয়জন, ঘন জনসমাগমে মৃত্যু-আহত হওয়ার ঘটনা বেড়ে চলেছে। শুধু আনন্দের উৎসবে পরিণত নয় বরং বড় সমস্যার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সুইজারল্যান্ড-এর মত উন্নত নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও ৪০ জনের মতো প্রাণহানি হয়েছে, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির ঘটনাও ধরতে হবে সতর্কবার্তা হিসেবে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে যদি পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপত্তা-আধারিত উদযাপন না হয়, তবে একই রকম বিপদ এড়ানো সহজ হবে না।

আতশবাজি শুধু আনন্দ নয়,জীবন, পরিবেশ, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে উৎসব মানবকল্যাণে রূপান্তরিত হয়।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 225 x 270 Position (2)
Position (2)